দুই প্রজন্ম, এক সুরসাধক, পণ্ডিত অমিয়রঞ্জনের স্মৃতিচারণায় রাঘব চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর মা শীলা চট্টোপাধ্যায়
আজকাল | ০১ আগস্ট ২০২৬
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবদান চিরকালীন৷ তাঁর স্নেহ, নিয়মনিষ্ঠ চর্চা এবং সঙ্গীতের প্রতি সমর্পণ তৈরি করেছে বহু শিল্পী। এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বহমান সেই সুরসাধনার অমৃতধ্বনি। মহান শিল্পীর প্রয়াণে গুরুর স্মৃতিচারণায় দুই প্রজন্ম, রাঘব চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর মা শীলা চট্টোপাধ্যায় কথা বললেন আজকাল ডট ইন-এর সঙ্গে।
রাঘব চট্টোপাধ্যায় বলেন, "ওঁকে নিয়ে বলার মতো আমি কেউ নই৷ আমি ওঁর সামান্য একজন ছাত্র মাত্র৷ ভারতবর্ষে বিষ্ণুপুর ঘরানার ধারক বাহক বলা যায় পণ্ডিত অমিয়রঞ্জনকে৷ পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরেই বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রচার প্রসার হয়৷ তারপর পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ওঁর ভাইয়েরা নীহাররঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, এঁরা সকলেই বিষ্ণুপুর ঘরানায় ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের চর্চা করেছেন৷ অমিয়বাবু ছিলেন সকলের বড় এবং ১০০ বছর বয়স পর্যন্ত সুরসাধনা করেছেন একজন সাধকের মতো৷"
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সুরসাধনা করেছেন৷ কেবল নিজের সঙ্গে সুরের আত্মিক যোগ ছিল তাই নয়, বহু ছেলেমেয়েকে শিখিয়েছেন৷ রাঘব বলেন, "গত মার্চ মাসেও আমি গিয়েছিলাম মাস্টারমশাইয়ের কাছে৷ কথা হল। আমার মা শ্রদ্ধেয়া শীলা চট্টোপাধ্যায়৷ তাঁর বয়স এখন ৮০ বছর৷ দুই তিন বছর আগে পর্যন্তও মা যেতেন পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় এর কাছে শিখতে৷ ওঁর সবচেয়ে পুরনো ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মা অন্যতম৷"
পারিবারিক পরিচিতি রাঘব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ওঁর স্ত্রীকে জেঠিমা বলে ডাকতেন এবং স্ত্রী-পুত্র সকলের সঙ্গেই পারিবারিক সম্পর্ক রাঘব চট্টোপাধ্যায়ের৷ রাঘব চট্টোপাধ্যায় বলেন, "ওই বাড়িটাকে সঙ্গীতের পীঠস্থান বলা যায় এবং সকলেই বিদগ্ধ মানুষ৷ আমার মনে হয়, ওই বাড়িতে যাঁরাই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা করতে গিয়েছেন সকলেই উপকৃত হয়েছেন।"
ব্যক্তিজীবনে পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন ছিলেন নিয়মনিষ্ঠ মানুষ৷ প্রত্যহ সকালে উঠে কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করা ছিল তাঁর অভ্যাস৷ রাঘবের কথায়, "যেমন একজন আদর্শ মানুষের জীবন হওয়া উচিত মাস্টারমশাই ঠিক তেমন ছিলেন৷ নিয়মিত রেওয়াজ, ছাত্রছাত্রীদের শেখানো, দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগে৷ যখনই গিয়েছি তখনই সস্নেহে কাছে টেনে নিয়েছেন৷ কিছু জানতে চাইলে বুঝিয়ে দিতেন৷ মায়ের কাছে আমার সঙ্গীতের হাতেখড়ি কিন্তু মায়ের পরেই আমার শেখা পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে৷ পরবর্তীকালে পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী, উস্তাদ রশিদ খানের কাছেও শিখেছি৷ কিন্তু যোগাযোগটা থেকে গিয়েছিল৷"
কথায় কথায় গুরু-শিষ্যের একান্ত মুহূর্তের কথাও উঠে আসে৷ রাঘব বলেন," ব্যস্ততার কারণে বহুদিন যাওয়া হয়নি৷ যোগাযোগ হয়নি৷ হঠাৎ একদিন মাস্টারমশাইকে ফোন করলাম৷ মাস্টারমশাই বললেন, আরে তুমি তো ক্ল্যাসিক্যালটা ভালই গাইতে জানতাম কিন্তু তুমি যে আধুনিক গানও এত ভাল গাও, আমার ভীষণ আনন্দ হয়, আমি রেডিওতে টিভিতে শুনি যে কত সুন্দরভাবে মর্ডান মিউজিককে তুমি পরিবেশন করো৷ আমি তো শীলার কাছে খোঁজ নিই।"
শিষ্য এবং বলা ভাল নাতির বয়সি রাঘবের খোঁজ খবরও রাখতেন অমিয়রঞ্জন৷ রাঘব চট্টোপাধ্যায় এর মা শীলা চট্টোপাধ্যায় গান শিখতে যেতেন৷ শীলা চট্টোপাধ্যায় বলেন, "আমি বহুবছর মাস্টারমশাইয়ের কাছে গান শিখেছি৷ তখন উত্তর কলকাতার বাড়িতে যেতাম গান শিখতে৷ পরবর্তীকালে তো বাড়ি বদল করলেন তখনও প্রতি সপ্তাহে শনিবার করে আমি চলে যেতাম মাস্টারমশাইয়ের কাছে৷ খাতা পেন নিয়ে বসে পড়তাম, বন্দিশগুলো নোট করতাম৷ আমি তাণপুরা নিয়ে বসলে বলতেন, মেলাও তাণপুরা, কী রাগ গাইবে? তারপর বলতেন দেশ-ই গাও৷ তখন বন্দিশ গাইতাম উনি বসে বসে শুনতেন৷"
যে গুরুর কাছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে চিনেছেন ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের অলিগলি, সেই গুরু ছাড়া আর কাকেই বা সন্তানের সুরশিক্ষার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা যায়! শীলা চট্টোপাধ্যায়, ছোট্ট রাঘব চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে গিয়েছিলেন পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় এর কাছে৷ শীলা চট্টোপাধ্যায় বলেন, " রাঘবের হাত ধরে নিয়ে গেলাম মাস্টারমশাইয়ের কাছে৷ বললাম, আমার ছেলেটাকে আপনি তৈরি করুন৷ এবং আজ যে রাঘবের এত নাম ডাক, দেশ বিদেশের মানুষ ওঁর গান শুনতে চায়, এই সবটা হয়েছে আমার গুরুর জন্য৷ আমি আমার গুরুর কাছে যা শিখেছিলাম সেটাই আমি উজাড় করে দিয়েছিলাম আমার ছেলেকে৷"
শতর্বষের সুরসাধনায় শীলা চট্টোপাধ্যায়ের মতো অসংখ্য শিল্পী তৈরি করে গিয়েছেন পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন। যাঁরা মনে করেন, খাওয়া ঘুমের মতোই সঙ্গীতও জীবনের অপরিহার্য অংশ৷ অশীতিপর শিল্পী ছোট্ট কিশোরীর মতোই বলে ওঠেন আমি প্রার্থনা করি আমি যেন জন্মজন্মান্তর এমন গুরুর সান্নিধ্য পাই এবং এভাবেই নিয়মিত সঙ্গীতের সাহচর্য পেতে পারি৷