আজকাল ওয়েবডেস্ক:এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাংলার বহু মানুষের নাম বাদ পড়েছে। এদের মধ্যে অনেকেরই রেশন বন্ধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ করে এসআইআর-এ নাম বাদ পড়া একজন কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছিলেন। সেই মামলায় রায়ে বিচারপতি হিরন্ময় ভট্টাচার্য জানিয়েছে যে, এসআইআর-এ নাম বাদ পড়লেই রেশন সরবরাহের সুবিধা বন্ধ করা যাবে না। নির্দেশে উল্লেখ রয়েছে, আদালতের অনুমতি ছাড়া আবেদনকারীর মাসিক রেশন পাওয়ার অধিকারের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কোনও কঠোর বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করতে পারবে না।
কোচবিহার জেলার বাসিন্দা উম্মে সালমা খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরের বিশেষ সচিবের ৪ জুন, ২০২৬-এর একটি আদেশকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। ওই আদেশে এসআইআর প্রক্রিয়ার ফলাফলের ভিত্তিতে "অযোগ্য ও ভুয়ো সুবিধাভোগীদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার" অভিযান শুরুর কথা বলা হয়েছিল। সালমার স্থানীয় ন্যায্য মূল্যের দোকানের ডিলার তাঁকে জানিয়েছিলেন যে, ভোটার তালিকায় নিজের নাম বা অবস্থান সংক্রান্ত কোনও আপিলের প্রমাণ দেখাতে না পারলে তাঁর রেশন সুবিধা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
বিচারপতি হিরন্ময় ভট্টাচার্য ২৮ জুলাইয়ের আদেশে পর্যবেক্ষণ করেন যে, এখানে বিবেচনার জন্য বড় প্রশ্নটি হল- ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়াকে কি গণবণ্টন ব্যবস্থার (রেশন) মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ বন্ধের ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা যায়? এছাড়া আরেকটি প্রশ্ন হল, 'ফর্ম ৬'-এর অধীনে কোনও আবেদন বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কি এই ধরনের সরবরাহ বন্ধ করা যেতে পারে?
দপ্তরের ৪ জুনের ওই আদেশের শিরোনাম ছিল- "পশ্চিমবঙ্গে পরিচালিত ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর), ২০২৬-এর ফলাফলের ভিত্তিতে অযোগ্য রেশন সুবিধাভোগীদের যাচাইকরণ ও নাম বাদ দেওয়া।" মহিলাদের জন্য 'অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার' মাসিক সহায়তা প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একই বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল যে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর যারা বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য আবেদন করেছেন, কেবল তাঁরাই এই প্রকল্পের সুবিধা পেতে পারেন।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় ৯০ লক্ষেরও বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট ফের তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে যে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিষয়টি ভোটদান-বহির্ভূত অন্য কোনও ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে না।
আধার, প্যান বা ভোটার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়: কলকাতা হাইকোর্টঅন্য একটি মামলায়, কলকাতা হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ সম্প্রতি রায় দিয়েছে যে, ভোটার কার্ড, আধার এবং প্যান কার্ড ভারতীয় নাগরিকত্বের চূড়ান্ত বা অকাট্য প্রমাণ নয়। সুমন মোল্লার দায়ের করা একটি 'হেবিয়াস কর্পাস' (বন্দি ব্যক্তিকে সশরীরে আদালতে হাজির করার নির্দেশ চেয়ে করা আবেদন) মামলার শুনানিকালে আদালত এই পর্যবেক্ষণটি করে। সুমন মোল্লার ভাইপো নাসিরকে (৪৬) 'এসআইআর' প্রক্রিয়ার সময় ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার পর গত ১৮ জুন থেকে একটি ডিটেনশন ক্যাম্পে (আটক কেন্দ্রে) রাখা হয়েছিল। যদিও সেই নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটি আপিল তখনও বিচারাধীন ছিল।
বিচারপতি দেবাংশু বসাক এবং বিচারপতি অজয় কুমার গুপ্তের ডিভিশন বেঞ্চ আবেদনটি খারিজ করে দেয়। আদালত তার আদেশে বলে, "আবেদনকারী এবং আটক ব্যক্তি- উভয়েই আটক ব্যক্তির ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। 'ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫' (অভিবাসন ও বিদেশী আইন)-এর বিধান অনুযায়ী প্রমাণের যে দায়ভার তাঁদের ওপর বর্তায়, তা তাঁরা পালন করতে পারেননি।"
আদালত পর্যবেক্ষণ করে যে, ভোটার আইডি কার্ড ভারতীয় নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। এটি কেবল ভোটার তালিকায় আটক ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্তির প্রমাণ। আদালত আরও জানায় যে, আধার কার্ড এবং প্যান কার্ডও তাঁর ভারতীয় নাগরিকত্ব চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয়।আদালত উল্লেখ করে যে, রিট আবেদনের সঙ্গে আটক ব্যক্তির প্রপিতামহ এবং পিতামহের 'রেকর্ড অফ রাইটস' (জমির মালিকানা সংক্রান্ত নথিপত্র) সংযুক্ত করা হয়েছিল। তবে, এগুলি আটক ব্যক্তির ভারতীয় নাগরিকত্ব চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করে না।
আদেশে বলা হয়, "বিভিন্ন নথিপত্রে আটক ব্যক্তির পিতার নামের ভিন্নতা রয়েছে। নথিপত্রের মাধ্যমে আটক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর মাসির সম্পর্ক বা যোগসূত্র স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। বংশসূত্রে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য আটক ব্যক্তি যাদের সঙ্গে নিজের যোগসূত্র দেখাতে চেয়েছেন, তাঁদের ভারতীয় নাগরিকত্বও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অর্থাৎ, বংশসূত্রে আটক ব্যক্তির নাগরিকত্ব প্রমাণিত হয়নি।" এছাড়া, আটক ব্যক্তির বাবা-মায়ের মৃতদেহ কোথায় পাওয়া যেতে পারে, সেই তথ্য প্রকাশ করতে পারেননি বলেও আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করে।