দেশ কাকে বলে? নিজের শহরের রাস্তায় একা একা বৃষ্টিতে ভেজা, কবিতার আড্ডায় বন্ধুদের সঙ্গে তুমুল তর্ক কিংবা মায়ের হাতের রান্না। কোনটা? সবচেয়ে ভালো জানেন তসলিমা নাসরিন। বোঝেনও। শনিবার রবীন্দ্র সদনের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে সেই দেশ, কালের কথাই বার বার ঘুরে এল তাঁর গলায়, ‘এই জন্মে বুঝি আর বাংলাদেশে ফেরা হলো না।’ কলকাতা ফের তাঁকে বুকে টেনে নিয়েছে। তসলিমা খুশি। তবে নির্বাসনের দীর্ঘ যন্ত্রণাও যে ভুলতে পারেনি, বুঝিয়ে দিয়েছে তা-ও।
পদ্মাপাড়ের জন্মভূমিতে থাকতে পারেননি। মৌলবাদের তাড়া খেয়ে এ পার বাংলায় পালিয়ে এসেছিলেন। কলকাতা তাঁকে কোল পেতে দিয়েছিল ঠিকই। কিন্তু থিতু হতে পারেননি এ পাড়েও। সেই নিয়ে তাঁর দুঃখ আছে, হতাশাও। এ দিন কিছুই গোপন করলেন না। প্রায় ২০ বছর পরে মহানগরে ফিরে এসে তাঁর প্রতিটা শব্দ, বাক্যে ফুটে উঠল সেই যন্ত্রণা, ‘কলকাতায় ফিরেছি। এই কথাটা বলতেই দুই দশক লেগে গেল।’
নীল রং নাকি বিশ্বাসের প্রতীক। এ দিন তসলিমা বেছে নিয়েছিলেন নীল সিল্কের শাড়ি, গাঢ় সবুজ ব্লাউজ। কোন চাকচিক্য নয়। হালকা সাজ। তাঁকে ঘিরে ছিলেন নিরাপত্তারক্ষীরা। সেটাই স্বাভাবিক। ইরানের আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের ফতোয়া দেওয়ার ২৮ বছর পরে সলমন রুশদির উপরে হামলা হয়েছিল। তা-ও ভরা মঞ্চে। তসলিমাও যে মৌলবাদীদের টার্গেট, বলাই বাহুল্য। কিন্তু এত রক্ষী সমভিব্যাহারে মোটেই খুশি নন তিনি। বুঝিয়েও দিলেন সেটা, ‘একজন লেখককে নিজের ভাষার শহরে আসতে পুলিশের সাহায্য নিতে হবে, সেটাই বেদনার।’ কিন্তু কিছু করারও যে নেই।
ভিড়ের মাঝে তাই বোধহয় তসলিমার চারপাশে পাক খাচ্ছিল এক অদৃশ্য নিঃসঙ্গতা। তবে তিনি তো এমনই। যাঁদের তাড়া খেয়ে বাংলা ছাড়তে হয়েছিল, ফিরেই তাঁদের আক্রমণ শানালেন। এমন তীরের ফলার মতো প্রত্যয়ও বোধহয় তাঁরই আছে। কোনও রাখঢাক রাখলেন না। মৌলবাদ আর তথাকথিক ‘সেকুলারদের’ এক আসনে বসিয়ে বলে দিলেন, ‘সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে ইসলামি জিহাদিরা হত্যা করে, আর বামপন্থীরা কুৎসা আর অপবাদ রটায়।’ সিপিএমের ভরা জমানায় তাঁকে বাংলা ছাড়তে হয়েছিল, এ কথা তিনি আজও ভোলেননি।
কেন তাঁকে বাংলা ছাড়তে হলো? সেকুলার-লিবারালদের কাছে সেই প্রশ্নই করেছেন লেখিকা, ‘আমি তো সহজ কথা লিখেছিলাম। আমি কি কাউকে হত্যা করেছি? তবুও আমাকে কেন এই শাস্তি দেওয়া হলো?’ এর পরেই যেন চাবুক চালালেন, ‘যাঁরা নিজেদের জীবনে আধুনিকতা চান, কিন্তু একজন মুসলমানের জন্য সেই আধুনিকতা চান না—তাঁরা আর যাই হোক, প্রগতিশীল নন।’
অনেকেই তসলিমার কলকাতায় ফেরানোর মধ্যে বিজেপির ‘মৌলবাদী’ রাজনীতি দেখছেন। তাঁদেরও জবাব দিয়েছেন লেখিকা, ‘কারও প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মানে আনুগত্যের চুক্তি সই করা নয়।’ ২০০৭ সালের ২২ নভেম্বর, আজও তাঁর কাছে যেন কালকের ঘটনা। মনে করিয়ে দিলেন, তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ দ্বিখণ্ডিত নিষিদ্ধ করা হলেও পরে কলকাতা হাইকোর্ট সেই নিষেধাজ্ঞা খারিজ করে দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে হার মানতে হয়েছিল রাজনীতির কাছেই।
এ বার কী কলকাতায় পাকাপাকি ভাবে থাকবেন লেখিকা? নাহ, সেই রকম কোনও ইঙ্গিত তিনি দেননি। তিলোত্তমা তাঁকে দু’হাত দিয়ে বুক টেনে নিয়েছে, এ তাঁর কাছে পরম প্রাপ্তি। এ দিন বামপন্থীদের বিরুদ্ধে বার বার নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তিনি। বক্তৃতা শেষেও সেই রাগ-অভিমান ঝরে পড়েছে। সরাসরি বলেছেন, ‘ইতিহাস মনে রাখবে, কারা দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল, আর কারা খুলল।’
তসলিমার প্রত্যাবর্তন অনুষ্ঠান অবশ্য নিষ্কন্টক হলো না। কবি জয় গোস্বামী মঞ্চে ওঠায় সাময়িক বিশৃঙ্খলা তৈরি হলো। মঞ্চে জয়কে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তসলিমা নিজে। কিন্তু ‘ঘুমিয়েছ ঝাউপাতা’-র কবিকে যেন সহ্য করতে পারলেন না কলকাতার দর্শক। এর নেপথ্যে কি রাজনৈতিক কারণ? নাকি অন্য কিছু? হতভম্ব মুখে মঞ্চ ছেড়ে নেমে গেলেন বৃদ্ধ কবি। অনেকের মতে, এও তো অসহিষ্ণুতা।
লেখিকাকে সংবর্ধনা দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পদক, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছবি। তসলিমার মুখে তখন যুদ্ধজয়ের হাসি। যেন ফিরে পেলেন নিজের ভাষার আকাশ। তবে যুদ্ধ শেষ হয়নি। জন্মভূমি এখনও অধরা, আর বিশ্বাসের, স্বাধীনতার লড়াইও থামেনি। প্রাপ্তি যতই উজ্জ্বল হোক, তসলিমার পথচলা এখনও অসমাপ্ত।