সিবিআই ডিরেক্টর বা লোকপাল বাছাইয়ের কমিটিতে প্রধান বিচারপতি রয়েছেন। তা হলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের কমিটিতে কেন তাঁকে রাখা হবে না? সুপ্রিম কোর্টের এমন প্রশ্নের মুখে ‘প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে’ ঢাল করল কেন্দ্রীয় সরকার। শুক্রবার বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মার ডিভিশন বেঞ্চকে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা স্পষ্ট ভাষায় বলে দিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ করার কোনও কারণ থাকতে পারে না।’
বিষয়: মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে প্রধান বিচারপতির ভূমিকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্ন
কী নিয়ে বিতর্ক?
২০২৩ সালের আইনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের কমিটি থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান কমিটিতে কারা?
তিন সদস্যের কমিটিতে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা।
সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্ন কী?
সিবিআই ডিরেক্টর বা লোকপাল বাছাইয়ের কমিটিতে প্রধান বিচারপতি থাকলে, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের কমিটিতে তাঁকে রাখা হবে না কেন—এই প্রশ্ন তুলেছে আদালত।
কেন্দ্রের যুক্তি কী?
সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দেহ করার কোনও কারণ নেই। নির্বাচিত সরকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে কাজ করবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
আদালতের অবস্থান কী?
আদালত জানিয়েছে, বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবিশ্বাস করার নয়। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ এবং সেই নিয়োগে জনসাধারণের আস্থা রয়েছে কি না, সেটাই মূল বিষয়।
কেন্দ্রের আরও কী আবেদন?
মামলাটি বৃহত্তর সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানোর আবেদন করেছে কেন্দ্র।
কেন সাংবিধানিক বেঞ্চ?
সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা, সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আগের রায়ের সীমা স্পষ্ট করতে বৃহত্তর বেঞ্চের প্রয়োজন বলে কেন্দ্রের দাবি।
২০২৩-এর Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners (Appointment, Conditions of Service and Term of Office) Act অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের কমিটি থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে। ফলে তিন সদস্যের কমিটিতে সরকারের দু’জন প্রতিনিধি থাকছেন—প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। অন্য সদস্য হলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা। আগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর জায়গায় থাকতেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি।
এই নতুন আইনের সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে একাধিক মামলা দায়ের হয় সুপ্রিম কোর্টে। বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মার ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানিতেই আদালত প্রশ্ন তোলে, সিবিআই ডিরেক্টর বা লোকপাল বাছাইয়ের কমিটিতে প্রধান বিচারপতি থাকলে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের কমিটিতে তাঁকে রাখা হবে না কেন?
পাল্টা সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা যুক্তি দেন, সরকার বা প্রশাসন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে গিয়ে কাজ করবে এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। নিয়োগ কমিটির গঠন নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে সংসদ যে আইন পাশ করেছে, তার ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলা। একই সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলির উপর সংবিধান যে আস্থা রেখেছে, তাকেও সন্দেহের চোখে দেখা হবে। তুষারের কথায়, ‘প্রধানমন্ত্রী পদের সঙ্গে বিশেষ মর্যাদা জড়িয়ে রয়েছে।’ একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে যদি আস্থা না থাকে, তা হলে মন্ত্রিসভা গঠনের সময়েও কি তাঁকে কোনও প্রাক্তন বিচারপতি বা বাইরের কোনও ব্যক্তির পরামর্শ নিতে বলা হবে?’
কেন্দ্রের যুক্তির জবাবে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দেয়, বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবিশ্বাস করার নয়। বরং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ এবং সেই নিয়োগে সাধারণ মানুষের আস্থা রয়েছে কি না, সেটাই মূল প্রশ্ন। বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীকে কেন বিশ্বাস করব না? অবশ্যই আমরা প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্বাস করি।’ তবে তাঁর বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনাররা যাতে স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারেন, সেটা দেখা খুব জরুরি।
কেন্দ্রের তরফে মামলাটি বৃহত্তর সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানোর আবেদনও করা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের যে কাঠামো রয়েছে, তা ব্যাখ্যা করা জরুরি। একই সঙ্গে, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের নিয়ম ঠিক করার ক্ষেত্রে সংসদের ক্ষমতা নিয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। কেন্দ্রের বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের আগের রায় সংসদে আইন না হওয়া পর্যন্ত একটি ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সেই রায়কে যদি স্থায়ী নিয়ম হিসেবে ধরা হয়, তা হলে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে ভবিষ্যতে সংসদ নতুন আইন করতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন উঠবে। তাই আগের রায়ের সীমা এবং সংসদের আইন করার ক্ষমতা—দু’টি বিষয়ই বৃহত্তর সাংবিধানিক বেঞ্চে স্পষ্ট হওয়া দরকার।
প্রশ্ন: নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের কমিটিতে প্রধান বিচারপতি নেই কেন?
২০২৩ সালের আইনে প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে কমিটিতে রাখা হয়েছে।
প্রশ্ন: বর্তমানে নিয়োগ কমিটিতে কারা রয়েছেন?
প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা।
প্রশ্ন: প্রধান বিচারপতিকে রাখার পক্ষে আদালতের যুক্তি কী?
সিবিআই ডিরেক্টর ও লোকপাল বাছাইয়ের কমিটিতে প্রধান বিচারপতি থাকেন। তাই নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রেও তাঁকে রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আদালত প্রশ্ন তুলেছে।
প্রশ্ন: কেন্দ্র কি প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত নিয়ে আদালতের প্রশ্নের বিরোধিতা করেছে?
হ্যাঁ। তুষার মেহতা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ করার কোনও কারণ নেই এবং তাঁর সিদ্ধান্তের উপর আস্থা রাখা উচিত।
প্রশ্ন: আদালত কি প্রধানমন্ত্রীর উপর অনাস্থা প্রকাশ করেছে?
না। বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত স্পষ্ট করেছেন, প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্বাস না করার বিষয় এটি নয়। নির্বাচন কমিশনাররা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করতে পারবেন কি না, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: মামলার মূল আইনি প্রশ্ন কী?
নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের কমিটির কাঠামো সাংবিধানিক ভাবে বৈধ কি না এবং এই কাঠামো নিরপেক্ষ নিয়োগ নিশ্চিত করে কি না—তা নিয়েই মূল বিতর্ক।
প্রশ্ন: কেন্দ্র কেন বৃহত্তর সাংবিধানিক বেঞ্চ চাইছে?
সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ, সংসদের আইন করার ক্ষমতা এবং এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আগের রায় ভবিষ্যতে কী ভাবে প্রযোজ্য হবে—এই প্রশ্নগুলির স্পষ্ট নিষ্পত্তি চায় কেন্দ্র।
প্রশ্ন: আগের সুপ্রিম কোর্টের রায় নিয়ে কেন্দ্রের আপত্তি কোথায়?
কেন্দ্রের বক্তব্য, সংসদ নতুন আইন না করা পর্যন্ত আগের রায় একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে কার্যকর ছিল। সেটিকে স্থায়ী নিয়ম হিসেবে ধরা হলে সংসদের ভবিষ্যৎ আইন প্রণয়নের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।