এই ভাঁড়ে শুধু পয়সা নয়, জমছে টুকরো টুকরো ভালবাসায় ভরা স্বপ্ন। ভাবছেন এমন কেন? টিফিন বাঁচিয়ে স্বপ্ন পূরণ, তবে নিজের নয়। সহপাঠীদের স্বপ্ন পূরণেই এই খুদেরা শিখছে সঞ্চয়, সহমর্মিতা আর ব্যাঙ্কিং পাঠ। টিফিনের খুচরো পয়সাই এনে দেয় পুজোর নতুন জামা! ভাবতে অবাক লাগলেও জলপাইগুড়ির এই স্কুলের মাটির ভাঁড়ে লুকিয়ে কোন মানবিক গল্প? জানলে মন ছুঁয়ে যাবে আপনারও।
মাটির একটা ছোট্ট ভাঁড়। গায়ে কাঁচা হাতে লেখা কোনও এক পড়ুয়ার নাম, আবার কোনওটায় লেখা শিক্ষিকার নাম। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও এই ভাঁড়গুলির ভেতরে শুধু টাকা-পয়সা জমছে না, প্রতিদিন পরম মমতায় জমা হচ্ছে সহমর্মিতা, মানবিকতা আর এক সহপাঠীদের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন। জলপাইগুড়ির দেশবন্ধুনগরের আরআর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই ব্যতিক্রমী ‘লক্ষ্মীর ভাঁড়’ উদ্যোগ ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলেছে সর্বত্র।
স্কুলে ঢুকলেই সার দিয়ে রাখা এই মাটির পাত্রগুলি চোখে পড়ে। বিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষিকার নামে রয়েছে একটি করে আলাদা ভাঁড়। বাড়ি থেকে আনা টিফিনের টাকা থেকে বাঁচানো কয়েকটা কয়েন খুদেরা পরম আনন্দে সেই ভাঁড়ে ফেলেন রোজ। অন্যদিকে, শিক্ষিকারাও প্রতি মাসের বেতনের একটি অংশ নিয়মিত জমা রাখেন নিজেদের পাত্রে। সারা বছর ধরে তিল তিল করে জমে ওঠা এই সঞ্চয়ই দুর্গাপুজোর ঠিক আগে বদলে যায় বাঁধভাঙা খুশিতে, অর্থ অভাবের কারণে যে পড়ুয়াদের পরিবার নতুন পোশাক কিনতে পারে না, তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ব্র্যান্ড নিউ পুজোর জামা।
কাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা খুব ভালবাসার সঙ্গে বিবেচনা করে স্কুল কর্তৃপক্ষ। তবে কেবল উপহার দেওয়াই এই উদ্যোগের একমাত্র লক্ষ্য নয়। শিক্ষিকাদের কথায়, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের সঞ্চয়ের পাঠ দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে অর্থের সঠিক মূল্য বোঝানো, ব্যাঙ্কিং ধারণার প্রথম পাঠ দেওয়া এবং অন্যের অভাব উপলব্ধি করে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি করাই মূল উদ্দেশ্য।
বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই সামাজিক উদ্যোগের সূচনা। স্থানীয় কাউন্সিলর থেকে শুরু করে অভিভাবকরা সকলেই এই চিন্তাভাবনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। শিক্ষার আসল সংজ্ঞা যে শুধু পুঁথিগত পাঠে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মনের ভেতরের মানুষটিকে জাগিয়ে তোলা, জলপাইগুড়ির এই স্কুল প্রতিদিন তাদের ‘লক্ষ্মীর ভাঁড়’ সেটাই প্রমাণ করে চলেছে রোজ।