• সাপের বিষ নামাতে ওঝার কেরামতি, 'কুসংস্কারের' তুলোধনা করলেন পুলিশ আধিকারিক
    News18 বাংলা | ২৮ জুলাই ২০২৬
  • ক্যালেন্ডারের পাতায় এখন ২০২৬। মানুষের তৈরী যান, মঙ্গল গ্রহের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে , ভিন দেশে বসে ডাক্তাররা রোবোটিক সার্জারি করে সরিয়ে তুলছেন রোগীদের। অথচ মুর্শিদাবাদের এই গ্রামে এখনও সময় যেন থমকে রয়েছে কয়েক দশক আগে। সাপে কাটা এক মহিলাকে হাসপাতালে বা ডাক্তারের কাছে না নিয়ে গিয়ে ওঝা দিয়ে চলছে বিষ নামানোর কাজ। তবে এবার সেই দৃশ্য দেখে চুপ থাকেননি পুলিশের এক আধিকারিক। ডিউটিতে যাওয়ার সময় ওঝার তুক তাকে এক ‘সাপে কাটা’ রোগীকে মরতে দেখে সটান গাড়ি থেকে নেমে ঝাড়ফুক তুকতাকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন পুলিশের ওই আধিকারিক।

    ইতিমধ্যে সমাজ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গিয়েছে সেই ভিডিও। নেট নাগরিকরা কুর্নিশ জানিয়েছেন ওই আধিকারিকের বিজ্ঞানমনস্কতা এবং কুসংস্কার দূরীকরণে তাঁর সক্রিয় ভূমিকাকে। ইতিমধ্যে কয়েক লক্ষ মানুষ দেখেছেন সেই ভিডিও। পুলিশের ‘অন্য’ এই ভূমিকায় প্রশংসায় পঞ্চমুখ সাধারণ মানুষও। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার সূত্রপাত দু’দিন আগে মুর্শিদাবাদের সাগরপাড়া থানা এলাকার ঘোরাপাড়া গ্রামে। সেদিন রুটিন ডিউটিতে যাওয়ার সময় ঘোড়াপাড়া গ্রামে একটি বাড়ির সামনে প্রচুর লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়েন আব্বাস মন্ডল নামে  সাগরপাড়া থানার এক সাব ইন্সপেক্টর। পুলিশি অনুসন্ধিৎসা নিয়ে কিছুটা এগোতেই ওই অফিসারের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায়। তিনি দেখতে পান, সাপে কাটা এক মাঝবয়সী মহিলাকে কিছু লোক ঘিরে বসে রয়েছেন এবং তাঁকে ক্রমাগত নিমের পাতা খাইয়ে যাওয়া হচ্ছে।

    গোটা দৃশ্য দেখে সাগরপাড়া থানার ওই সাব-ইন্সপেক্টর আব্বাস মন্ডল সমবেত সকলকে জিজ্ঞাসা করে বসেন,” কোন যুগে বাস করছেন আপনারা।” সাপে কাটা রোগী, ওঝা এবং তাঁর আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকেদেরকে ওই অফিসার জিজ্ঞাসা করেন ,যদি সাপে কামড়ে থাকে তাহলে ওই মহিলাকে হাসপাতাল বা ডাক্তারের কাছে না নিয়ে গিয়ে এইভাবে কেন চিকিৎসা করানো হচ্ছে? ভাইরাল ভিডিওটিতে আরও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, ওই আধিকারিক যখন এলাকার মানুষকে জিজ্ঞাসা করছেন এইভাবে নিম পাতা খাইয়ে কি  সাপের বিষ ‘নামানো’ যায় ? তখন কুসংস্করে আচ্ছন্ন ওই গ্রামের বাসিন্দারা তাঁকে প্রত্যয়ের সঙ্গে জানাচ্ছেন-নিম পাতা খাইয়ে সাপের বিষ নামানো সম্ভব এবং এই ঘটনা গ্রামে তাঁরা আগেও দেখেছেন।

    সেই সময় কয়েকজন ওই আধিকারিকের সামনে দাবি করেন, ওই মহিলাকে বিষহীন সাপে কামড়েছে। তখন ওই আধিকারিক আবার উল্টে তাদের প্রশ্ন করে বসেন , নির্বিষ সাপ কামড়ে থাকলে ওঝা কেন গ্রামে এসেছে এবং নিম পাতা কেন খাওয়ানো হচ্ছে।  সমাজ মাধ্যমে এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর নেট নাগরিকদের অনেকে দাবি করেছেন, ওই ওঝাকে কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাওয়া উচিত। কেউ আবার লিখেছেন, স্যালুট স্যার, সমাজ এখনও কুসংস্কারে আবদ্ধ। সেই কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য ধন্যবাদ। সাগরপাড়া থানার কর্মরত ওই আধিকারিক সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,”ঘোড়াপাড়া গ্রামের মধ্যে দিয়ে কাজে যাওয়ার সময় হঠাৎই একটি জায়গায় কিছু লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমি ওই মহিলার বাড়িতে গিয়েছিলাম।

    তখনই গোটা ঘটনাটি জানতে পারি। এরপর আমি উদ্যোগ নিয়ে ওই মহিলাকে ডোমকল হাসপাতালে পাঠানোর জন্য ব্যবস্থা করেছিলাম। পরে শুনেছি ওই মহিলাকে সাগরপাড়া হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়েছে।” নিশান্ত দাস নামে এক চিকিৎসক জানান, বিষাক্ত সাপ কামড়ালে সেই বিষ লসিকা গ্রন্থি ও রক্তের মাধ্যমে সরাসরি শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। নিম পাতা খেলে সেই রস পাকস্থলীতে যায়। এই রস রক্তের বিষের উপর কোনও প্রভাব ফেলতে পারে না। নিমপাতার নানা ঔষধি গুণ বা জীবাণুশক ক্ষমতা থাকলেও সাপের রাসায়নিক বিষকে নিষ্ক্রিয় করার মত কোনও উপাদান এতে নেই। সম্পূর্ণ কুসংস্কার থেকে আজও কিছু লোক নিম পাতা খাইয়ে সাপের বিষ নামানো বা সাপে কামড়ের চিকিৎসা করেন। এটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন, কুসংস্কার এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক ধারণা। এইভাবে চিকিৎসা করলে সাপে কাটা রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।”
  • Link to this news (News18 বাংলা)