কলকাতা ডার্বি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, এটি আবেগ, ইতিহাস, গৌরব এবং প্রত্যাশার অন্য নাম। এই ম্যাচে ৯০ মিনিটের লড়াইয়ের বাইরে আরও অনেক গল্প থাকে। কখনও ফুটবলারের, কখনও কোচের। এ বারও তার ব্যতিক্রম নয়। শনিবার যুবভারতীতে মুখোমুখি হবে মোহনবাগান এবং ইস্টবেঙ্গল । তবে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি নজর থাকবে দুই ডাগআউটেও। এক দিকে ডার্বির পরীক্ষিত যোদ্ধা আন্তেনিও লোপেস হাবাস (Antonio Lopez Habas), অন্য দিকে মোহনবাগানের নতুন গ্রিক কোচ পানাগিয়োটিস দিমপেরিস (Panagiotis Dimperis)। কলকাতায় এসেছেন মাত্র কয়েক দিন আগে। শুক্রবারের অনুশীলন ধরলে দলের সঙ্গে মাত্র চারদিন প্রস্তুতি সেরেছেন। সেই প্রস্তুতি নিয়েই নামতে হবে ভারতীয় ফুটবলের সবচেয়ে আবেগঘন মঞ্চে। কিন্তু সময়ের অভাব নয়, আত্মবিশ্বাসকেই সঙ্গী করে ডার্বির অপেক্ষায় পানোস।
একটা সময়ে কলকাতার বড় কোচেরা ডার্বির আগে দীর্ঘ প্রাক-মরশুম প্রস্তুতি ছাড়া মাঠে নামার কথা ভাবতেই পারতেন না। এখন ফুটবলের বাস্তবতা বদলেছে। ডুরান্ড কাপের সূচির কারণে মরশুমের শুরুতেই ডার্বি। ফলে নতুন কোচদের হাতে প্রস্তুতির সময়ও সীমিত। সেই বাস্তবতার মুখোমুখি পানোসও। কলকাতায় আসার পর তিনটি অনুশীলন সেশন পেয়েছেন। শুক্রবারের সেশন মিলিয়ে চার। এমন পরিস্থিতিতে ডার্বি খেলাটা যে কঠিন, তা তিনি নিজেও মানছেন। কিন্তু মোহনবাগানের ডাগআউটে বসা মানেই বড় চ্যালেঞ্জ নেওয়া।
কলকাতায় পা রেখেই সমর্থকদের উন্মাদনা তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছে, এই ক্লাবের প্রত্যাশার উচ্চতা কতটা। তিনি বলেন, ‘কলকাতায় আসার পর থেকেই সমর্থকদের কাছ থেকে অসাধারণ ভালোবাসা পেয়েছি। ডার্বি দিয়ে যাত্রা শুরু করাটা খুবই রোমাঞ্চকর ছিল। প্রত্যাশা যে অনেক, সেটা আমি জানি। কিন্তু এটাকে চাপ হিসেবে দেখি না। বরং এটা আমাকে আরও অনুপ্রাণিত করে।’
প্রস্তুতির সময় কম হলেও নিজের দলের উপর আস্থা হারাচ্ছেন না তিনি। বলেওছেন, ‘অনেক কিছুর সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে হচ্ছে। কিন্তু আমরা প্রতিদিন উন্নতি করছি। আমি ইতিবাচক। আমার বিশ্বাস, এই দল যে কোনও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে।’
শনিবারের ডার্বিতে দুই কোচের অভিজ্ঞতার ফারাকও চোখে পড়ার মতো। এক দিকে হাবাস— ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম সফল কোচ, যিনি ডার্বির আবেগ, চাপ এবং গুরুত্ব সবটাই জানেন। কলকাতার ফুটবল সংস্কৃতিও তাঁর নখদর্পণে। বড় ম্যাচে তাঁর সাফল্যের রেকর্ডও ঈর্ষণীয়। এখনও পর্যন্ত ডার্বিতে অপরাজিত হাবাস।
অন্য দিকে পানোসের কাছে কলকাতা ডার্বি সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা। শহরে পা রাখার কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁকে নামতে হচ্ছে ভারতীয় ফুটবলের সবচেয়ে আবেগঘন ম্যাচে। এক পাশে ডার্বির অসংখ্য স্মৃতি আর সাফল্য নিয়ে হাবাস, অন্য পাশে প্রথমবার এই মঞ্চের উত্তাপ অনুভব করতে চলা পানোস। তাই যুবভারতীর ডাগআউটে এ বার লড়াইটা শুধু দুই কোচের নয়, অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন সাহসেরও।
তবে প্রতিপক্ষ কোচের সাফল্যকে সম্মান জানিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন পানোস। বলেছেন, ‘হাবাস অবশ্যই একজন সফল এবং অভিজ্ঞ কোচ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফুটবল ১১ জন বনাম ১১ জনের খেলা। মাঠে আমাদের নিজেদের কাজটাই করতে হবে। গত কয়েক দিন ধরে খেলোয়াড়দের সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম করছি। এখন সেই পরিশ্রমের ফল মাঠে দেখতে চাই।’
এই ডার্বিতে হয়তো একাদশে ১১ জনই ভারতীয় ফুটবলার খেলবেন। শেষ কোন ডার্বিতে এমনটা হয়েছে,তা বলা কঠিন। একজন বিদেশি ডেজান দ্রাজ়িচ পরে নামতেও পারেন, বা শুরু করলেও পুরো ম্যাচ খেলার সম্ভাবনা কম। তবে পানোস বলছেন, ‘ভারতীয় ফুটবলারদের সম্পর্কে আমার ভালো ধারণা রয়েছে। ওদের নিয়ে আমি খোঁজখবর নিয়েছি। আমাদের দলেও অনেক ভালো ভারতীয় ফুটবলার আছে। ওদের সামর্থ্যের উপর আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে।’
ডার্বির উত্তেজনা, গ্যালারির গর্জন, শহরের আবেগ— সব কিছুর মধ্যেও পানোস নিজের দর্শন থেকে সরতে রাজি নন। তাঁর কাছে প্রতিটি ম্যাচই সমান গুরুত্বপূর্ণ। বলেছেন, ‘আমার কাছে প্রতিটি ম্যাচই ডার্বির মতো। দলের প্রথম ম্যাচ হোক বা পঞ্চম, ম্যাচের আগের রাতে আমার ঘুম আসে না। কারণ আমি সব সময় জয়ের কথা ভাবি। ডার্বিও তার ব্যতিক্রম নয়।’
আর ৫০-৬০ হাজার সমর্থকের সামনে প্রথমবার কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা? পানোস বলেন, ‘এত বেশি দর্শকদের সামনে আগে কখনও কোচিং করাইনি। কিন্তু এটাকে আমি চাপ হিসেবে দেখি না। বরং গ্যালারি ভর্তি সমর্থকদের সামনে ফুটবল খেলাটা একজন কোচের জন্য দারুণ অনুপ্রেরণার।’
FAQ
প্রশ্ন: কলকাতা ডার্বির আগে পানোস কত দিনের প্রস্তুতি পেয়েছেন?
উত্তর: কলকাতায় আসার পর সব মিলিয়ে পানোস চার দিনের প্রস্তুতি পেয়েছেন।
প্রশ্ন: হাবাসের সঙ্গে তুলনায় পানোসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
উত্তর: হাবাস ডার্বির অভিজ্ঞ কোচ। বড় ম্যাচে তিনি এখনও পর্যন্ত অপরাজিত। অন্য দিকে পানোসের জন্য এটাই প্রথম কলকাতা ডার্বি।
প্রশ্ন: ডার্বিকে কী ভাবে দেখছেন মোহনবাগান কোচ?
উত্তর: তাঁর মতে, প্রতিটি ম্যাচই ডার্বির মতো গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিটি ম্যাচেই জয়ের লক্ষ্য নিয়ে নামা উচিত।
প্রশ্ন: গ্যালারির বিপুল সমর্থক উপস্থিতি কি চাপ তৈরি করছে?
উত্তর: না। পানোসের মতে, এটি চাপ নয়, বরং বাড়তি অনুপ্রেরণা।
শনিবারের ডার্বিতে আলোচনার কেন্দ্রে থাকবেন হাবাস, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যুবভারতীর আলোয় নিজের প্রথম বড় পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত পানোসও। এক দিকে ডার্বি-স্পেশালিস্ট হাবাস, অন্য দিকে নতুন স্বপ্ন নিয়ে আসা গ্রিক কোচ। অভিজ্ঞতা হয়তো এক জনের পক্ষে, কিন্তু আত্মবিশ্বাস আর সাহস অন্য জনের হাতিয়ার। আর ডার্বির ইতিহাস বারবার বলেছে, এই মঞ্চে অসম্ভব বলে কিছু হয় না।