দুর্গাপুজোর প্রতিমার ডাকের সাজ, মুকুট, টোপর, অলংকরণ কিংবা মণ্ডপসজ্জা এসবের অন্যতম প্রধান উপকরণ শোলা। পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোট ব্লকের বনকাপাশি গ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই শোলা শিল্পের জন্য পরিচিত। কিন্তু অনেকেই জানেন না, এই গ্রামের শিল্পীদের হাতে যে শোলা পৌঁছায়, তা শুধু স্থানীয় এলাকা থেকেই নয়, রাজ্যের একাধিক জেলা থেকে সংগ্রহ করে আনতে হয়। শিল্পীদের জানানো তথ্য অনুযায়ী, বনকাপাশি গ্রামের কারিগররা মূলত উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া ও উত্তর দিনাজপুর জেলা থেকে শোলা সংগ্রহ করেন।
এছাড়াও স্থানীয় খাল-বিল ও জলাভূমি থেকেও অল্প পরিমাণে শোলা পাওয়া যায়। এই সমস্ত জায়গা থেকে বড় গাড়িতে করে কাঁচামাল বনকাপাশি গ্রামে আনা হয়। শোলা শিল্পী বাপ্পা গড়াই জানান, প্রতি বছরই ভবিষ্যতের কথা ভেবে কিছুটা বেশি শোলা মজুত রাখা হয়। এ বছর বর্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে আরও বেশি পরিমাণে শোলা সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে। তাঁর কথায়, আগামী দিনে যদি শোলার জোগানে সমস্যা হয়, তাহলে সেই মজুত কাঁচামালই শিল্পীদের ভরসা হবে।যদিও কাঁচামালের কোনও অভাব নেই, তবু উদ্বেগ অন্য জায়গায়। দুর্গাপুজোকে সামনে রেখে এই সময়ে সাধারণত রাজ্যের বিভিন্ন পুজো কমিটি, প্রতিমা শিল্পী এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বড় বড় অর্ডার আসতে শুরু করে।
কিন্তু এবার এখনও পর্যন্ত সেই প্রত্যাশিত বরাত মেলেনি। শিল্পী বুল্টি সাঁতরা বলেন, এখন টুকটাক কাজ চলছে। শোলা এসে গিয়েছে, তবে অন্যান্য বছরের মত কাজের চাপ এখনও তৈরি হয়নি। ধীরে ধীরে কাজ শুরু হবে বলেই আশা করছেন তাঁরা। আরেক শিল্পী শিখা মাঝি জানান, রথযাত্রার পর থেকেই সাধারণত কাজের ব্যস্ততা অনেক বেড়ে যায়। অন্য বছর এই সময়ে এতটাই কাজ থাকে যে খাওয়ারও সময় মেলে না। কিন্তু এবার এখনও মূলত স্থানীয় ছোটখাটো কাজই চলছে। কলকাতা বা বড় পুজো কমিটির কাজ এখনও শুরু হয়নি।
শিল্পীদের আশা, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দুর্গাপুজোর অর্ডার আসতে শুরু করবে। কারণ বনকাপাশি গ্রামের শোলা শিল্প শুধু পূর্ব বর্ধমানেই নয়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের পুজো মণ্ডপ ও প্রতিমা সাজানোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। তাই কাঁচামাল মজুত থাকলেও এখন শিল্পীদের সবচেয়ে বড় অপেক্ষা নতুন কাজের বরাতের। একদিকে বিভিন্ন জেলা থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ, অন্যদিকে দক্ষ কারিগরদের সূক্ষ্ম হাতের কাজ, এই দুইয়ের সমন্বয়েই বনকাপাশি গ্রামের ঐতিহ্যবাহী শোলা শিল্প আজও টিকে রয়েছে। শিল্পীদের বিশ্বাস, বরাত বাড়লে আবারও প্রাণ ফিরে পাবে এই প্রাচীন বাংলার লোকশিল্প।