মনিরুল হক, কোচবিহার: ২০২৫ সালে তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কনভয়ে হামলার ঘটনায় বড় পদক্ষেপ করল পুলিশ। বুধবার বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হল কোচবিহার জেলা তৃণমূল কংগ্রেস সভাপতি তথা প্রভাবশালী নেতা অভিজিৎ দে ভৌমিককে।
পুলিশ সূত্রের খবর, কনভয়ে হামলার ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ভোট-পরবর্তী হিংসা, উস্কানিমূলক বক্তব্য এবং আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত আরও কয়েকটি মামলাতেও তাঁর নাম রয়েছে বলে তদন্তকারীদের দাবি। ধৃত নেতাকে বিমানবন্দর থেকে কড়া নিরাপত্তায় কোচবিহারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে আদালতে পেশ করে পুলিশি হেফাজতের আবেদন জানানো হতে পারে বলে সূত্রের খবর।
তদন্তকারীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর গতিবিধির উপর নজর রাখা হচ্ছিল। নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই এদিন অভিজিৎ দে ভৌমিককে গ্রেপ্তার করা হয়।
উল্লেখ্য, গত বছরের আগস্টে কোচবিহারের খাগড়াবাড়ি এলাকায় শুভেন্দু অধিকারীর কনভয়ে হামলার ঘটনা রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন ফেলেছিল। অভিযোগ, পূর্বপরিকল্পিতভাবে তৎকালীন বিরোধী দলনেতার বুলেটপ্রুফ গাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। ভাঙচুর, ইটবৃষ্টি এবং ব্যাপক উত্তেজনার জেরে এলাকা কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিপুল পুলিশবাহিনী মোতায়েন করতে হয়েছিল। ঘটনাস্থল থেকেই সাত জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
সেই সময় বিজেপির অভিযোগ ছিল, হামলার নেপথ্যে তৃণমূলের একাধিক স্থানীয় নেতার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে উঠে এসেছিল অভিজিৎ দে ভৌমিকের নাম। তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেছিলেন, তাঁকে খুনের উদ্দেশ্যেই এই হামলার ছক কষা হয়েছিল। তাঁর আরও দাবি ছিল, তৎকালীন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী উদয়ন গুহের প্রত্যক্ষ মদতেই এই হামলা সংঘটিত হয়। এমনকী ঘটনায় বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা দুষ্কৃতীদের যোগ থাকার অভিযোগও তুলেছিলেন তিনি। যদিও সেই সমস্ত অভিযোগ তৎকালীন তৃণমূল নেতৃত্ব অস্বীকার করেছিল।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এই মামলার তদন্তে গতি আসে। ইতিমধ্যেই একই ঘটনায় কোচবিহার ২ নম্বর ব্লকের তৃণমূল সভাপতি শুভঙ্কর দে-কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সেই ধারাবাহিকতায় এবার গ্রেপ্তার হলেন অভিজিৎ দে ভৌমিক। তদন্তকারীদের দাবি, হামলার পরিকল্পনা, সংগঠন এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ধৃত নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে বলেও মনে করছে পুলিশ।
রাজনৈতিক মহলে অভিজিৎ দে ভৌমিক দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাবশালী সংগঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তৃণমূলের অন্দরে তাঁকে অভিষেক ব্যানার্জি ঘনিষ্ঠ বলেও অনেকে মনে করতেন। জেলা সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তাঁর প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে দলের একাংশের দাবি। প্রাক্তন জেলা সভাপতি রবীন্দ্রনাথ ঘোষের পদ হারানোর নেপথ্যেও তাঁর ভূমিকা ছিল বলে অতীতে দলের অন্দরে অভিযোগ উঠেছিল। যদিও এবিষয়ে প্রকাশ্যে কখনও মন্তব্য করেননি অভিজিৎ।
পুলিশের দাবি, শুধুমাত্র কনভয়ে হামলার মামলাই নয়, তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী তদন্ত এগোবে। রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই মামলায় অভিজিৎ দে ভৌমিকের গ্রেপ্তার নতুন করে রাজ্যের রাজনৈতিক তরজা উসকে দিল। এখন তদন্তে আর কারও নাম সামনে আসে কি না এবং আদালতে পুলিশ কী তথ্য পেশ করে, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহল ও প্রশাসনের।