জঙ্গলমহলে এবার ‘রয়্যাল’ গর্জন: বেঙ্গল সাফারি থেকে ঝাড়গ্রামে ৫ বাঘ, তৈরি ১,০০০ একরের মেগা পার্ক
দৈনিক স্টেটসম্যান | ২১ জুলাই ২০২৬
অরণ্যসুন্দরী ঝাড়গ্রামের পর্যটন মানচিত্রে (Tourism Map) যুক্ত হতে চলেছে এক নতুন অভূতপূর্ব অধ্যায়। উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স ঘেঁষা শিলিগুড়ির ‘বেঙ্গল সাফারি’র (Bengal Safari) সাফল্যের অনুকরণে এবার জঙ্গলমহলের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে এক বিশাল মুক্ত সাফারি পার্ক (Open Safari Park)। শাল-পিয়াল ঘেরা লালমাটির দেশে প্রায় ১,০০০ একর জুড়ে বিস্তৃত এই মেগা সবুজ প্রকল্পে এবার শোনা যাবে দক্ষিণরায়ের গর্জন। রাজ্য বন দপ্তরের প্রশাসনিক তৎপরতা এখন একেবারে তুঙ্গে।
মূলত কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের পর্যটকদের ঘরের কাছেই খোলা জঙ্গলে বাঘ ঘুরে বেড়ানোর রোমাঞ্চ উপহার দিতেই এই টাইগার সাফারির (Tiger Safari) আয়োজন করা হচ্ছে। আর এই প্রকল্পের মূল আকর্ষণ হিসেবে শিলিগুড়ির বেঙ্গল সাফারি পার্ক থেকে ঝাড়গ্রামে স্থানান্তর করা হচ্ছে ৫টি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার (Royal Bengal Tiger) ও চিতাবাঘ (Leopard)।
রাজ্যের বনমন্ত্রী মনোজ ওঁরাও (Manoj Oraon) সম্প্রতি জঙ্গলমহলের এই ১,০০০ একরের মেগা সাফারি পার্ক গড়ে তোলার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। এর পরেই রাজ্য জু অথরিটি (State Zoo Authority) শিলিগুড়ি বেঙ্গল সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষকে ৫টি বাঘ ও চিতাবাঘ চিহ্নিত করার এবং স্থানান্তরের প্রয়োজনীয় সমস্ত আইনি ও প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ করার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি, চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে সেন্ট্রাল জু অথরিটির (Central Zoo Authority) কাছে ইতিমধ্যেই আবেদন জানানো হয়েছে।
বন দপ্তর সূত্রের খবর, শুধু বাঘ বা চিতাবাঘেই থমকে থাকবে না এই পার্ক। পরবর্তী ধাপে জীববৈচিত্র্য (Biodiversity) আরও সমৃদ্ধ করতে বেঙ্গল সাফারি থেকেই সুদৃশ্য হগ ডিয়ার (Hog Deer) বা বামন হরিণ এবং স্পটেড ডিয়ার (Spotted Deer) বা চিতল হরিণ ঝাড়গ্রামে আনার এক দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।
বন্যপ্রাণীদের সুপ্রজনন ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে শিলিগুড়ির বেঙ্গল সাফারি পার্ক দীর্ঘ দিন ধরেই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সফল প্রজনন কর্মসূচির (Breeding Program) সৌজন্যে সেখানে বাঘের সংখ্যা বেড়ে বর্তমানে চোদ্দয় পৌঁছেছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন চিড়িয়াখানা ও পার্কের সঙ্গে বন্যপ্রাণী বিনিময় কর্মসূচিতে (Animal Exchange Program) রাজ্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারছে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে ‘স্নেহাশিস’ নামক একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে পাঠানো হয়েছিল আলিপুর চিড়িয়াখানায় (Alipore Zoo)। ২০২৪ সালে দু’টি বাঘ স্থানান্তর করা হয় ত্রিপুরার সিপাহিজলা চিড়িয়াখানায় (Sepahijala Zoo)। এমনকি সম্প্রতি প্রাণী বিনিময়ের আওতায় শিলিগুড়ি থেকে একটি বাঘ দার্জিলিংয়ের পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুওলজিকাল পার্কে (Padmaja Naidu Himalayan Zoological Park) পাঠানো হয়েছে, যার বদলে বেঙ্গল সাফারিতে আনা হয়েছে বিরল প্রজাতির একটি সাইবেরিয়ান রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার (Siberian Royal Bengal Tiger)। শিলিগুড়ি পার্কের এই বাড়তি বন্যপ্রাণীকে কাজে লাগিয়েই এবার ঝাড়গ্রামের নতুন পার্কটিকে দ্রুত সমৃদ্ধ করে তোলার প্রক্রিয়া গতি পেয়েছে।
ঝাড়গ্রামের এই প্রাণী উদ্যানটির ইতিহাস কিন্তু বেশ চমকপ্রদ। ১৯৮০ সালে অত্যন্ত সাধারণ এবং ছোট পরিসরে একটি ‘হরিণ উদ্যান’ (Deer Park) হিসেবে এর সূচনা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০১৪ সালে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সম্মতিতে এটি পূর্ণাঙ্গ চিড়িয়াখানার স্বীকৃতি পায় এবং নতুন নামকরণ হয় ‘জঙ্গলমহল জুওলজিকাল পার্ক’ (Jangalmahal Zoological Park)।
এবার সেই চিড়িয়াখানার সীমানা বহুগুণ বাড়িয়ে প্রায় ১,০০০ একরের এক সুবিশাল মুক্ত সাফারি পার্কে রূপান্তর করা হচ্ছে, যা দক্ষিণবঙ্গের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে (Wildlife Conservation) এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
এই মেগা প্রজেক্ট প্রসঙ্গে বনমন্ত্রী মনোজ ওঁরাও জানান, এই উদ্যোগের ফলে কেবল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সুনিশ্চিত হবে না, বরং জঙ্গলমহল তথা সামগ্রিক দক্ষিণবঙ্গের স্থানীয় অর্থনীতি (Local Economy) ও ইকো-ট্যুরিজমে (Eco-Tourism) এক অভূতপূর্ব জোয়ার আসবে।
কলকাতা বা পার্শ্ববর্তী জেলাগুলির মানুষকে খোলা অরণ্যে বাঘের অবাধ বিচরণ দেখার জন্য আর সুদূর উত্তরবঙ্গ বা ভিন্ন রাজ্যে পাড়ি দিতে হবে না। শিলিগুড়ি থেকে প্রথম দফায় ৫টি বাঘ স্থানান্তরের মাধ্যমেই সূচনা হচ্ছে এই রোমাঞ্চকর যাত্রার, আর ভবিষ্যতে সেখানে যুক্ত হবে আরও একাধিক নতুন বন্যপ্রাণী।