পাহাড় বাদ, শিলিগুড়ি আর মহকুমা নয় এখন থেকে পূর্ণাঙ্গ জেলা; ঢুকছে জলপাইগুড়িও
আজ তক | ২১ জুলাই ২০২৬
Siliguri New District Update: দীর্ঘদিনের অপেক্ষার এবার অবসান হতে চলেছে। পাহাড়ের থেকে সমতলের অংশটি আলাদা কেটে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে শিলিগুড়ি। এই নতুন শিলিগুড়ি জেলার সঙ্গে যুক্ত করা হবে জলপাইগুড়ি জেলার ডাবগ্রাম ও ফুলবাড়ির দুটি গ্রাম পঞ্চায়েত এবং উত্তর দিনাজপুর জেলার একাংশ। দার্জিলিং জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে প্রাথমিক কাজকর্ম শুরু করে দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন শিলিগুড়ি জেলার প্রশাসনিক সীমানা চিহ্নিত করতে মৌজা ম্যাপ এবং ভোটার তালিকা তৈরির কাজ দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। শিলিগুড়ি নতুন জেলা হিসেবে ঘোষিত হলে জেলাশাসকের দফতর এবং জেলা আদালত কোথায় স্থাপন করা হবে তা নিয়েও জোর আলোচনা চলছে। যদিও প্রশাসনিক মহল মনে করছে পাহাড়ে নতুন স্বশাসনের বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের রূপ নেওয়ার পরেই এই নতুন জেলার অনুষ্ঠানিক ঘোষণা হতে পারে।
আশির দশক থেকে নতুন জেলা গড়ার লড়াই
শিলিগুড়িকে আলাদা জেলা বানানোর দাবি মোটেই আজকের নয়। আশির দশকের শেষভাগে সুবাস ঘিসিংয়ের নেতৃত্বে পাহাড়ে পৃথক রাজ্যের দাবিতে আন্দোলন জোরদার হয়েছিল। সে সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎকালীন রাজ্য সরকার দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল গঠন করে সমস্যাটি কিছুটা সামাল দেয়। পরবর্তীকালে বাম আমলে ২০০৭ থেকে ২০০৮ সাল নাগাদ শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে পৃথক জেলা গঠনের ভাবনা রূপ পেতে শুরু করে। তৎকালীন রাজ্য সরকার দার্জিলিংয়ের পাশাপাশি শিলিগুড়িতেও একটি সমান্তরাল জেলা প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে জেলাশাসক পুলিশ সুপার এবং পরিবহণ আধিকারিকরা পালা করে দার্জিলিং ও শিলিগুড়িতে বসে কাজ সামলাতেন। এরপর রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে শিলিগুড়িতে পৃথক পুলিশ কমিশনারেট তৈরি করা হয়। শিলিগুড়ি মহকুমার তিনটি ব্লক দার্জিলিং জেলা পুলিশের অধীনে রাখা হলেও তাদের যাবতীয় দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয় কমিশনারেটের কর্তাদের হাতে। পরিস্থিতি সামলাতে ঘোষপুকুরে দার্জিলিং জেলা পুলিশের আলাদা দফতর গড়ে তোলা হয়। রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা দীর্ঘদিন ধরে এই পৃথক জেলা গঠনের দাবি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছেন বলে শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের অতিরিক্ত এগজিকিউটিভ অফিসার মানবেন্দ্র ঘোষ জানান। শিলিগুড়ির বিজেপির জেলা সভাপতি অরুণ মণ্ডলের বক্তব্য তারা বেশ কিছুদিন ধরে শিলিগুড়ি পৃথক জেলা ঘোষিত হওয়ার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছেন।
সুরক্ষাবলয় বাড়াতে চিকেনস নেক এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি
ভৌগোলিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল চিকেনস নেক অঞ্চলে প্রশাসনিক নজরদারি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতেই এই বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন। সেনাবাহিনী বিএসএফ সিআরপিএফ এবং এসএসবির মতো কেন্দ্রীয় বাহিনীর শীর্ষ কর্তাদের দপ্তর গড়ার কাজ এলাকায় আগেই সমাপ্ত হয়েছে। বাগডোগরা ও শিবমন্দির অঞ্চলকে আলাদা পুরসভা হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদকে গ্রামীণ এলাকায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় করা হচ্ছে। শিলিগুড়ি শহরের ভেতরে থাকা বর্তমান মহকুমা পরিষদ ভবনটিকেই জেলাশাসকের মূল কার্যালয়ে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এই ভবনে বর্তমানে জেলাশাসকের একটি ক্যাম্প অফিস রয়েছে। মাটিগাড়া নকশালবাড়ির বিজেপি বিধায়ক আনন্দময় বর্মন নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর থেকেই শিলিগুড়িকে পৃথক জেলা করার দাবিতে সরব হন।
নাগরিক সভা ও ব্যবসায়ী মহলের স্বাগত বার্তা
শিলিগুড়িকে জেলা ঘোষণার প্রশাসনিক প্রস্তুতি শুরু হতেই শহরের সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক আনন্দ লক্ষ্য করা গেছে। সম্প্রতি নাগরিক মঞ্চের পক্ষ থেকেও শিলিগুড়িকে পৃথক জেলা করার জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। এই দাবিকে সামনে রেখে তারা শহরে একটি বড়সড় নাগরিক সভার আয়োজন করেছেন। নাগরিক মঞ্চের সম্পাদক রতন বণিক জানান ভৌগোলিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্বের দিক থেকে শিলিগুড়িকে এখনই আলাদা জেলা ঘোষণা করা জরুরি। এই দাবির সমর্থনে তারা দ্রুত পথে নেমে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ নর্থ বেঙ্গলের ফোসিন সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ দাস সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, শিলিগুড়িকে পৃথক জেলার মর্যাদা দেওয়ার সূচনা বাম আমলেই হয়েছিল। রাজ্য সরকার শেষ পর্যন্ত শিলিগুড়িকে জেলা ঘোষণা করলে সমস্ত ব্যবসায়ী মহল অত্যন্ত খুশি হবে। অপরদিকে আলাদা জেলা গড়ার সিদ্ধান্ত এবং বাসিন্দাদের উৎসাহের মাঝেই জঙ্গিপুরকে পৃথক জেলা করার খবরেও ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে তুমুল উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে।
প্রশাসনিক বৈঠকে বিধায়কদের জোরালো প্রস্তাব
রাজ্যে প্রশাসনিক বৈঠক হতেই বিজয়ী রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা মানুষের এই পুরনো দাবি রাজ্য প্রশাসনের সামনে তুলে ধরেছেন। চম্পাসারিতে দার্জিলিং জেলা প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে আয়োজিত বৈঠকে দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা ছাড়াও শিলিগুড়ির বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ, মাটিগাড়া নকশালবাড়ির বিধায়ক আনন্দময় বর্মন এবং ডাবগ্রাম ফুলবাড়ির বিধায়ক শিখা চট্টোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠক থেকে বিধায়করা শিলিগুড়িকে পৃথক জেলা করার জোর সওয়াল করেন। জলপাইগুড়ি জেলার অন্তর্গত ডাবগ্রাম ও ফুলবাড়ি বিধানসভার বিশাল গ্রামীণ এলাকাকে নতুন শিলিগুড়ি জেলার অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি সেখানে আলাদা পুরসভা গঠনের প্রস্তাব দেন তারা। বিধায়ক আনন্দময় বর্মন প্রস্তাব জমা দিয়ে জানান জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে শহরের এলাকা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই মাটিগাড়া ও ডাবগ্রাম ফুলবাড়ির বিস্তীর্ণ অংশকে যুক্ত করে গ্রেটার শিলিগুড়ি গঠন করা উচিত। যদি তা সম্ভব না হয় তবে মাটিগাড়া শিবমন্দির আঠারোখাই এবং বাগডোগরা অঞ্চল নিয়ে নতুন পুরসভা গঠিত হতে পারে। শিলিগুড়ি জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মজবুত রাখতে পুরো শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের অধীনে ফাঁসিদেওয়া খড়িবাড়ি এবং নকশালবাড়ি থানাকে যুক্ত করার দাবি তোলেন তিনি। বিধায়ক শিখা চট্টোপাধ্যায়ও বলেন, এলাকার মানুষকে ছোটখাটো প্রশাসনিক কাজের জন্য বারবার জলপাইগুড়িতে যেতে হয় যা বেশ কষ্টদায়ক। তবে বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ এই বৈঠকের খুঁটিনাটি নিয়ে কোনও মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন।
উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং সাংসদের বার্তা
বৈঠকে অংশ নিয়ে দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা শিলিগুড়ির পাশাপাশি সমগ্র উত্তরবঙ্গের ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন বিগত বেশ কয়েক বছরে উত্তরবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় রোগীদের বাধ্য হয়ে বারান্দা ও মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে। সমস্যা মোকাবিলায় সেখানে অবিলম্বে আরও ১০০টি নতুন বেডের বন্দোবস্ত করার চিন্তাভাবনা চলছে। এর পাশাপাশি হাসপাতাল চত্বরে সক্রিয় দালাল চক্রের দাপট সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং শহরের বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমগুলির ওপর সরকারি নজরদারি কড়া করার বার্তা দেন সাংসদ।