গল্পের মহেশ বিচার পায়নি। হাড়-পাঁজর বেরিয়ে আসা রুগ্ন অবলা প্রাণীটার অবনত মাথায় কোপ মেরে শেষমেশ মুক্তি পায়নি গফুরও। ফুটানিগঞ্জে সেই যেন মহেশেরই পুনর্জন্ম ঘটালেন পরিচালক সায়ন্তন মুখোপাধ্যায়।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মহেশ গল্প বঙ্গসন্তানদের ছোটবেলায় মনে দাগ কেটেছিল। সায়ন্তনও চেয়েছিলেন মহেশ নিয়ে কাজ করার। কিন্তু যুতসই চিত্রনাট্য ছিল না। শেষমেশ লেখক অর্কদীপ মল্লিকা নাথ, প্রয়াত নাট্যব্যক্তিত্ব হরিমাধব মুখোপাধ্যায়ের জীবনের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের গল্পকে মিলিয়ে ফুটানিগঞ্জের মহেশ ছবির চিত্রনাট্য প্রস্তুত করেন।
১৯৫০-৭০ দশক জুড়ে বহুরূপী, নান্দীকার, থিয়েটার সেন্টার, চতুর্মুখ এবং সুন্দরমের নাট্যকাণ্ডে উদ্বেলিত হরিমাধব বালুরঘাট থেকে কলকাতায় পড়তে এসে সেই নাটকের নেশাতেই মজে গিয়েছিলেন। পরে পাকাপাকি ভাবে বালুরঘাটে ফিরে স্থানীয় তিনটি নাট্যদলকে একত্র করে ত্রিতীর্থ নাট্যদল তৈরি করেন। এই ছবিও সেই নাট্যমন্দিরের কাহিনি দিয়েই শুরু।
ছবিটি আদতে গল্পের মধ্যে গল্প। হরিমাধব জীবন-চরিত্রে অভিনয় করেছেন লোকনাথ দে। ছবিতে চরিত্রটির নাম চন্দ্রমাধব। রাজনীতির পাকেচক্রে তাঁর নাট্যচর্চাই প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। একদা নাটকের দলে তাঁরই ছাত্র তথা রাজনীতিবিদ অমর্ত্য ঘোষ (রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়)-এর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পথনাটক ছেড়ে প্রসিনিয়াম থিয়েটারে ফিরেও কূল পাননি চন্দ্রমাধব।
শেষমেশ সিদ্ধান্ত নেন, তিনি ছবিই বানাবেন। পরে প্রোডাকশন ম্যানেজার (খরাজ মুখোপাধ্যায়)-ও খুঁজে পাওয়া যেতেই শুরু হয় ছবির শুটিং। সব চরিত্রের জন্যই অভিনেতা-অভিনেত্রী পান চন্দ্রমাধব। কেবল ছবির মুখ্য চরিত্র অর্থাৎ মহেশ চরিত্রে অভিনয় করার জন্য মায়াবি চোখের ষাঁড় মিলছে না! অনেক খোঁজাখুঁজি, নানা টানাপড়েনের পরে একটি ষাঁড় ভারী পছন্দ হয় চন্দ্রমাধবের। কথায়–কথায় জানতে পারেন, ষাঁড়টার নাম গফুর। শুনে লাফিয়ে ওঠেন চন্দ্রমাধব। কিন্তু বিপত্তি ঘটে মালিক ষাঁড়টি ভাড়া দিতে রাজি না হওয়ায়। রাতের অন্ধকারে শেষমেশ মহেশকে চুরিই করেন চন্দ্রমাধব। শরৎচন্দ্রের গল্পের কিছু অনুষঙ্গও রয়েছে ছবি। তবে গল্পের গফুরের মতো পরিণতি হয়নি ছবির চন্দ্রমাধবের।
এই ওয়েব ফিল্মটি বাস্তবধর্মী গল্প, জীবন্ত চরিত্র এবং আবেগময় মুহূর্তের মাধ্যমে দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করে। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরও যথাযথ। ছবির এডিটিং প্রশংসনীয়। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়, অর্ণ মুখোপাধ্যায়, অমিত সাহা, অনুরাধা মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় আলাদা করে উল্লেখ করার মতোই। সব মিলিয়ে এই কাজ একবার দেখে ফেলতেই পারেন। এক ওটিটি প্ল্যাটফর্মে স্ট্রিম করছে ওয়েব ফিল্মটি।