কেউ বলেন, শব্দই নাকি ব্রহ্ম! কেউ মনে করেন, শব্দের অন্দরেও লুকিয়ে থাকে একটি জাতির সামগ্রিক ইতিহাস। আজ আমরা যে শব্দ বলি, হাজার বা দুই হাজার বছর আগে তা ঠিক কেমন শোনাত? সে সব শব্দের অর্থই বা কেমন ছিল? শব্দকে ঘিরে এমন অজস্র প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই কলকাতায় তৈরি হলো দেশের প্রথম শব্দ-মিউজ়িয়াম (Museum of Word)— ‘শব্দলোক’।
২০২০ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রথম এমন একটি মিউজ়িয়াম তৈরির পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন। ২০২১ সালে শুরু হয় কাজ। জাতীয় গ্রন্থাগার, সংস্কৃতি মন্ত্রক, ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ সায়েন্স মিউজ়িয়ামস (NCSM) এবং DRONAH-এর যৌথ উদ্যোগে তৈরি করা হয় এই জাদুঘর। প্রথম পর্যায়ে খরচ হয়েছে প্রায় ১৪ কোটি টাকা।
রবিবার জাতীয় গ্রন্থাগারের ঐতিহাসিক বেলভেডিয়ার হাউসে মিউজ়িয়ামটির উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত-সহ বিশিষ্ট অতিথিরা।
মিউজ়িয়ামটির বিশেষত্ব হলো, এটি আর পাঁচটা মিউজ়িয়ামের মতো নয়। এখানে গেলে শুধু শব্দের ইতিহাস জানা নয়, সেই ইতিহাসকে নিজের চোখে পরখ করা ও কানে শোনারও সুযোগ মিলবে। কারণ মিউজ়িয়াম কর্তৃপক্ষ শব্দ, ধ্বনি, লিপি আর ইতিহাসকে এক সুতোয় গেঁথে তুলে ধরেছেন আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে। সেই অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করতে মিউজ়িয়ামে তৈরি হয়েছে ৯টি থিমভিত্তিক গ্যালারি। আদি শব্দ, মাতৃভাষা, ভাষার বিবর্তন, মৌখিক ঐতিহ্য, বিভিন্ন ভাষার মহাপুরুষদের অবদান, পারফর্মিং আর্টস, সর্বজনীন সংলাপ এবং পাবলিক লাইব্রেরির ইতিহাস— সবই রয়েছে এক ছাদের নীচে।
তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো, এক একটি শব্দের সফরের কাহিনি। কোনও শব্দ এক হাজার বা দুই হাজার বছর আগে কী ভাবে উচ্চারিত হতো, তার অর্থ কী ছিল, আর সময়ের সঙ্গে কী ভাবে বদলেছে তার ধ্বনি ও রূপ— তা অডিও-ভিজ়ুয়াল প্রযুক্তিতে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে ভাষার ইতিহাস এ বার শুধু পড়া নয়, শোনাও যাবে।
শুধু তা-ই নয়, ভারতের ভাষাগত ঐতিহ্যের নানা দুর্লভ নিদর্শনও স্থান পেয়েছে এই মিউজ়িয়ামে। রয়েছে ব্রাহ্মী, পালি-সহ প্রাচীন লিপির নিদর্শন, দুর্লভ পাণ্ডুলিপি, তাম্রলিপি, পুরোনো মুদ্রা, ছাপাখানার ইতিহাস, পুরুলিয়ার ছৌ মুখোশ, উত্তরবঙ্গের গম্ভীরার মুখোশ এবং আদিবাসী শিল্পকর্ম।
পাশাপাশি রয়েছে ডিজিটাল ডিসপ্লে ও ইন্টারঅ্যাকটিভ ইনস্টলেশনের মতো আধুনিক প্রযুক্তি।
সূত্রের খবর, এই মুহূর্তে প্রথম পর্যায়ে ভারতের সংবিধানে স্বীকৃত ২২টি ভাষার ইতিহাস, শব্দভাণ্ডার এবং ধ্বনিগত বিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে। আগামী পর্যায়ে আরও বহু ভারতীয় ভাষা, বিশেষ করে আদিবাসী ভাষাগুলিকেও এই প্রকল্পে যুক্ত করা হবে।
FAQ
১. দেশের প্রথম শব্দ-মিউজ়িয়ামের নাম কী?
দেশের প্রথম শব্দ-মিউজ়িয়ামের নাম ‘শব্দলোক’ (Museum of Word)।
২. শব্দলোক কোথায় অবস্থিত?
কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারের ঐতিহাসিক বেলভেডিয়ার হাউসে এই মিউজ়িয়াম তৈরি হয়েছে।
৩. শব্দলোকের উদ্বোধন কে করেছেন?
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মিউজ়িয়ামটির উদ্বোধন করেন।
৪. শব্দলোক তৈরির পরিকল্পনা কবে ঘোষণা করা হয়েছিল?
২০২০ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই প্রকল্পের ঘোষণা করেন।
৫. এই মিউজ়িয়াম তৈরিতে কারা যুক্ত ছিল?
জাতীয় গ্রন্থাগার, সংস্কৃতি মন্ত্রক, ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ সায়েন্স মিউজ়িয়ামস (NCSM) এবং DRONAH-এর যৌথ উদ্যোগে এটি তৈরি হয়েছে।
৬. শব্দলোকে কী কী দেখা যাবে?
শব্দের ইতিহাস, ভাষার বিবর্তন, প্রাচীন লিপি, দুর্লভ পাণ্ডুলিপি, তাম্রলিপি, পুরোনো মুদ্রা, মুখোশ, আদিবাসী শিল্পকর্ম এবং আধুনিক ডিজিটাল প্রদর্শনী দেখা যাবে।
৭. শব্দলোকের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ কী?
একটি শব্দ হাজার বা দুই হাজার বছর আগে কী ভাবে উচ্চারিত হতো এবং সময়ের সঙ্গে তার অর্থ ও ধ্বনি কী ভাবে বদলেছে, তা অডিও-ভিজ়ুয়াল প্রযুক্তির মাধ্যমে দেখানো হয়েছে।
৮. মিউজ়িয়ামে কতটি গ্যালারি রয়েছে?
এখানে ৯টি থিমভিত্তিক গ্যালারি রয়েছে।
৯. বর্তমানে কতটি ভাষাকে এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে?
ভারতের সংবিধানে স্বীকৃত ২২টি ভাষার ইতিহাস ও ধ্বনিগত বিবর্তন প্রথম পর্যায়ে তুলে ধরা হয়েছে।
১০. ভবিষ্যতে এই প্রকল্পে কী নতুন সংযোজন হবে?
পরবর্তী পর্যায়ে আরও বহু ভারতীয় ভাষা, বিশেষ করে বিভিন্ন আদিবাসী ভাষাকে এই মিউজ়িয়ামে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।