আজকাল ওয়েবডেস্ক: আজকাল ওয়েবডেস্ক: কেন্দ্রে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশজুড়ে উত্তরপ্রদেশ মডেলের অনুকরণে বুলডোজার নীতির প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। এবার সেই চেনা বুলডোজারের গর্জন শোনা গেল উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়াতেও। রেলের জমিতে গড়ে ওঠা উচ্ছেদ হওয়া হকার ও বস্তিবাসীদের আশ্রয়স্থল এবং গত এক মাস ধরে চলা বামেদের 'জনতার রান্নাঘর' এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দিল রেল কর্তৃপক্ষ। এভাবে কোনও আগাম পুনর্বাসন ছাড়াই হকার উচ্ছেদ ও গরিব মানুষের মুখে দু'মুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার জায়গাটি ভেঙে দেওয়ায় এই অভিযানে চরম উত্তেজনা ছড়িয়েছে গোটা এলাকায়।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৪ জুন। সেদিন রাতের অন্ধকারে হাবড়া স্টেশন ও তার আশেপাশের এলাকায় বুলডোজার চালিয়ে প্রায় দুই শতাধিক ছোট-বড় দোকান এবং পাঁচশোরও বেশি মানুষের বস্তি উচ্ছেদ করা হয়। রাতারাতি ঘর আর রুজি-রোজগার হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে এসে দাঁড়ান হাজার হাজার অসহায় মানুষ। এই গৃহহীন, সর্বস্বান্ত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে ঠিক তার পরদিন থেকেই হাবড়া রেল স্টেশন সংলগ্ন সিপিআই(এম)-এর হাবড়া শহর দক্ষিণ এরিয়া কমিটির ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের পার্টি অফিসে শুরু হয়েছিল 'জনতার রান্নাঘর' বা কমিউনিটি কিচেন।
গত এক মাস ধরে চলা এই রান্নাঘরের প্রথম পর্বের শেষ দিন ছিল গত বুধবার, ১৫ জুলাই। উদ্যোক্তারা জানিয়েছিলেন, সাময়িক বিরতির পর আরও বড় আকারে এই জনতার রান্নাঘর পুনরায় শুরু করা হবে। কিন্তু সেই প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই আজ শুক্রবার (১৭ জুলাই) সকালে আরপিএফ ও রেল আধিকারিকেরা বুলডোজার নিয়ে এসে পার্টি অফিসসহ ওই রান্নাঘরের পরিকাঠামো ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন।
রেল কর্তৃপক্ষের এই আকস্মিক ও কঠোর পদক্ষেপে স্বাভাবিকভাবেই ফুঁসছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ। নিজেদের ঘর ও দোকান হারানোর পর যেখানে পেট চালানোর একমাত্র ভরসা ছিল এই রান্নাঘর, সেটিও ভেঙে দেওয়ায় ভাঙা দপ্তরের সামনেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন এলাকাবাসী। এদিন ঘটনাস্থলেই সমবেত জনতা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান তোলেন, "গরীব মারা সরকার, আর নেই দরকার"। সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভ ও অসহায়তা প্রকাশ পাচ্ছিল তাঁদের চোখে-মুখে।
এই উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্থানীয় সিপিআই(এম) নেতৃত্ব। ভাঙা অফিসের সামনে দাঁড়িয়েই এক লোকাল নেতা আবেগঘন গলায় বলেন, "১৫ জুলাই ছিল আমাদের কমিউনিটি কিচেনের প্রথম পর্বের শেষ দিন। আর আজ ১৭ জুলাই ভেঙে দেওয়া হল আমাদের এই পার্টি অফিস। রেল মানুষের মাথার ছাদ কেড়ে নেওয়ার পর আমরা নাগরিকদের পেটের ভাতের ব্যবস্থা করেছিলাম বেশ কিছুদিন। কিন্তু সরকার বাহাদুরের তা সহ্য হলো না। ওদের ধারণা—গরিব মানুষের আবার পেট কী, খিদে কী! সেই রাগ থেকেই প্রথমেই ভাঙা হলো মানুষকে সংগঠিত করে পাশে দাঁড়ানোর এই জায়গাটা।"
তিনি আরও যোগ করেন, "যেখানে এত মানুষের মাথার ছাদ এভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, সেখানে আমাদের অফিস ভেঙে দেওয়াটাই স্বাভাবিক। আমাদের দুঃখ হয়েছে, যন্ত্রণা হয়েছে, কিন্তু আমরা বাধা দিইনি। কারণ মানুষ কষ্টে থাকলে কমিউনিস্ট পার্টি তার বাইরে থাকে না। তবে সময় দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, দিন বদলাবে। মানুষই আবার পার্টি অফিস বানাবে আজ অথবা কাল, এবং নিজেদের জায়গা-জমির অধিকার নিয়েই বানাবে।" রেলের এই আগ্রাসী অভিযানের পর হাবড়াজুড়ে এখন তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর ও মানবিক সংকটের আবহ তৈরি হয়েছে।