• জমির দলিল থাকলেই নাগরিকত্ব প্রমাণ হয় না: ঐতিহাসিক মামলায় স্পষ্ট জানালো কলকাতা হাইকোর্ট
    দৈনিক স্টেটসম্যান | ১৮ জুলাই ২০২৬
  • জমির দলিল বা স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা (ownership of immovable property) থাকলেই কি এ দেশের নাগরিকত্ব প্রমাণ করা সম্ভব? ভারতের নাগরিক কে আর কে নন, সেই সংক্রান্ত এক অত্যন্ত সংবেদনশীল মামলার শুনানিতে ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ কলকাতা হাইকোর্টের। উচ্চ আদালতের স্পষ্ট বক্তব্য, শুধুমাত্র জমির রেকর্ড বা দলিল দিয়ে কোনওভাবেই এ দেশের নাগরিকত্ব (Indian citizenship) প্রমাণ করা যায় না।

    বিচারপতি দেবাংশু বসাক এবং বিচারপতি মহম্মদ শব্বর রশিদির ডিভিশন বেঞ্চ (Division Bench) এই পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, বিদেশি নাগরিকরাও চাইলে ভারতে আইনিভাবে সম্পত্তি কিনতে পারেন। তাই এক টুকরো জমি কেনার নথির ওপর ভিত্তি করে কাউকে এ দেশের ‘স্বাভাবিক’ নাগরিক বলে মেনে নেওয়া যায় না।

    এই মামলার কেন্দ্রে রয়েছেন মুর্শিদাবাদের লালগোলার বাসিন্দা নাসির মোল্লা। চলতি বছরের ১৮ জুন তাঁকে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ (foreign national) সন্দেহে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বর্তমানে তিনি লালগোলার একটি হোল্ডিং সেন্টারে (detention centre) বন্দি রয়েছেন। রাজ্য নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (Special Intensive Revision or SIR) জেরে ভোটার তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ যাওয়ার পর এই বিপত্তি তৈরি হয়।

    নাসিরের পরিবার এই আটককে বেআইনি দাবি করে হাইকোর্টে একটি হেবিয়াস কর্পাস (habeas corpus) বা সশরীরে হাজিরার আবেদন জানায়। আদালতে নাসির মোল্লার তুতো ভাই সুমন মোল্লার পক্ষে তাঁর আইনজীবী দাবি করেন, নাসির এ দেশেরই বাসিন্দা এবং প্রমাণ হিসেবে বেশ কিছু রেজিস্ট্রিকৃত জমির দলিল (land deeds) আদালতে পেশ করা হয়। কিন্তু হাইকোর্ট সাফ জানিয়ে দেয়, এই নথি নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য মোটেও চূড়ান্ত দলিল নয়।

    মামলার শুনানিতে বিচারপতিরা বলেন, জমির রেকর্ড বা দলিল এ দেশের নাগরিকত্ব প্রমাণের গ্রহণযোগ্য নথি হতে পারে না। একজন বিদেশি নাগরিকও ভারতে স্থাবর সম্পত্তি (immovable property) ক্রয় করতে পারেন। কিন্তু শুধুমাত্র সেই কারণে আইনত ওই ক্রেতা ভারতীয় নাগরিক হয়ে যান না (does not, ipso facto, make such a purchaser an Indian citizen)।

    রাজ্য সরকারের তরফে আদালতে পেশ করা একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে যে, নাসির মোল্লা প্রায় ১৪-১৫ বছর আগে অবৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। যদিও পরিবারের দাবি, নাসিরের কাছে প্যান কার্ড (PAN card), আধার কার্ড (Aadhaar card) এবং পুরনো ভোটার আইডির মতো একাধিক ভারতীয় পরিচয়পত্র রয়েছে। কর্মসূত্রে কেরালামে থাকার সময়েই ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত কিছু জটিলতায় তাঁর নাম বাদ পড়েছিল বলে দাবি আইনজীবীর।

    আদালত নাসিরের আবেদনটি সরাসরি খারিজ না করে বিষয়টিকে মানবিকতার খাতিরে পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নাসির মোল্লা যে সত্যিই এ দেশের নাগরিক, তা প্রমাণের জন্য তাঁর পরিবারকে ২০ জুলাই ২০২৬-এর মধ্যে হলফনামা (affidavit) দিয়ে অকাট্য আইনি নথি পেশ করার শেষ ও চূড়ান্ত সুযোগ (one final opportunity) দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ।

    পশ্চিমবঙ্গের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যে এই রায় আইনি মহলে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া বা নাগরিকত্বের প্রমাণ নিয়ে এর আগেও একাধিকবার প্রশ্ন উঠেছে সাধারণ মানুষের মনে। হাইকোর্টের এই রায় স্পষ্ট করে দিল যে জমিজমার নথির চেয়েও নাগরিকত্ব আইনের সঠিক পদ্ধতি মেনে দেওয়া প্রামাণ্য পরিচয়পত্রই সবচেয়ে বেশি জরুরি। সেই নথি যে ঠিক কোনটা, তা নিয়ে অবশ্য ধোঁয়াশা রয়েছে।
  • Link to this news (দৈনিক স্টেটসম্যান)