• সর্বত্রই ডিমের মুখে ধৃতরা, উত্তরবঙ্গের এই জেলায় নেই ‘ডিমোক্র্যাসি’
    এই সময় | ১৭ জুলাই ২০২৬
  • নীলাঞ্জন দাস, রায়গঞ্জ

    বিশ্বরূপ বিশ্বাস, ইসলামপুর

    'চোর-চোর' স্লোগান। তার সঙ্গে ডিম বর্ষণ। তৃণমূল নেতাদের গ্রেপ্তারির পরে বার বার এই ছবি দেখা গিয়েছে। কখনও থানার সামনে, কখনও আদালত চত্বরে। নেতাকে না পেলে তাঁর বাড়িতে গিয়েও ডিম ছুড়ে এসেছে জনতা। উত্তরবঙ্গের জেলায় জেলায় একই ঘটনা। এর মধ্যেই ব্যতিক্রমী হয়ে উঠেছে একটি জেলা।

    ক্যুইজে জিজ্ঞেস করা হতে পারে, কোন জেলায় ধৃতদের বিরুদ্ধে একটিও ডিম উড়ে আসেনি? এর সহজ উত্তর হবে, উত্তর দিনাজপুর।

    অথচ এখানেও ক্ষমতার পালাবদলের পরে একের পর এক নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন। রায়গঞ্জ, হেমতাবাদ, ইটাহার, চোপড়া-সহ বিভিন্ন এলাকায়। পুকুর ভরাট, জাল লটারি, জমি দখল, শ্লীলতাহানি, মারধর, ভয় দেখানোর অভিযোগে পুলিশ ধরেছে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের। জোর করে টাকা আদায়, কাটমানি নেওয়া, বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র রাখা, আর্থিক কেলেঙ্কারি-সহ নানা অভিযোগ উঠেছে পূর্বতন শাসকের বিরুদ্ধে। ধৃতদের কেউ কেউ কাউন্সিলার, কেউ যুব ও ছাত্র নেতা। কেউ আবার ব্লক সভাপতি, গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য থেকে শুরু করে উপপ্রধান। এই নেতাদের ছায়াসঙ্গীরাও পুলিশের জালে পড়েছেন।

    ধৃতদের আদালতে পেশ করার সময়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন সাধারণ মানুষ। 'চোর-চোর' স্লোগান দিয়েছেন। তবে এখনও পর্যন্ত ধৃতদের কাউকে 'ডিম থেরাপির' সম্মুখীন হতে হয়নি। অথচ উত্তরবঙ্গের অন্য জেলাগুলির ছবি আলাদা। বিশেষ করে কোচবিহারে। এখানে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ধৃত রাজনৈতিক কর্মী ডিম 'খেয়েছেন'। শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ারও বাদ যায়নি। নামমাত্র হলেও তালিকায় আছে দক্ষিণ দিনাজপুর ও মালদাও। কিন্তু উত্তর দিনাজপুরে এই সংখ্যা 'শূন্য'।

    তৃণমূল সাংসদ ও শীর্ষ নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ডিমের মুখোমুখি হয়েছেন। প্রাক্তন মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস থেকে ডাকসাইটে নেতা সব্যসাচী দত্তর মতো কত নাম রয়েছে এই তালিকায়। এই ডিমের ভয়েই সিতাইয়ে যাননি কোচবিহারের তৃণমূল সাংসদ জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়া, এমনটা রটে গিয়েছিল। এই 'ডিমোক্র্যাসি' যখন সংক্রামিত হয়েছে উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গে, সেই সময়ে উত্তর দিনাজপুর কী ভাবে ব্যতিক্রমী রয়ে গেল?

    উত্তর দিনাজপুর তথা রায়গঞ্জের মানুষও এই সংস্কৃতিকে সমর্থন করেন। তাই এই জেলায় ডিম থেরাপি প্রশ্রয় পায়নি।' বিজেপি রাজ্য সভাপতি বার বার ডিম বর্ষণের বিরুদ্ধে বার্তা দিয়েছেন, কিন্তু ঘটনায় ছেদ পড়েনি।

    ডিম যে শুধু তৃণমূলের নেতাদের বেছে নিয়েছে, এমন নয়। সিপিএম নেত্রী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ও ডিমের শিকার হয়েছেন। সিপিএমের শহর এরিয়া কমিটির সদস্য শান্তনু অধিকারী বলেন, 'ডিম ছোড়া কোনও সভ্য সমাজের সংস্কৃতি হতে পারে না। দেশে আইন, পুলিশ, প্রশাসন আছে। যাঁরা দোষী, তাঁরা আইন অনুযায়ী শাস্তি পাবেন, এই বিশ্বাস জেলার মানুষের রয়েছে।' জেলা যুব কংগ্রেসের সহ সভাপতি সৌভিক রায় বলেন, 'এই জেলার বাসিন্দারা বরাবরই সহিষ্ণু। এখানকার মানুষ চান, দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দেওয়া হোক। তাই এ ধরনের ঘটনা এখানে ঘটেনি।'

    ডিম বর্ষণের বিরুদ্ধে বামপন্থীরা গোড়া থেকেই মুখ খুলেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, মিড-ডে মিলে যখন পড়ুয়াদের পাতে পর্যাপ্ত ডিম পড়ছে না, তখন এ ভাবে অপচয় কেন? সম্প্রতি ডিমের দামও বাড়ছে। উত্তরবঙ্গের অনেক জেলাতেই আট টাকার গণ্ডি ছাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে উত্তরবঙ্গের মধ্যে উত্তর দিনাজপুর অনেক বেশি সচেতনতার পরিচয় দিয়েছে বলে জেলাবাসীর মত। তবে তৃণমূল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এতটাই যে ডিম ছোড়ার ইচ্ছে একেবারে ছিল না, এমনটাও নয়।

    ডিম নিক্ষেপ থেকে অনেক জায়গায় পুলিশ নিরস্ত করেছে জনতাকে। অনেক জায়গায় এই বাধা কাজে না এলেও রায়গঞ্জে এসেছে। শহরে ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলার অসীম অধিকারী ওরফে নদো-কে গ্রেপ্তারির পরে জনতা ডিম নিয়ে প্রস্তুত হয়েছিল। তবে তারা পুলিশের বারণ শুনেছে। ডিম ছোড়া হয়নি। এ নিয়ে শহরের বাসিন্দা, শিক্ষক তপন বসাক বলেন, 'ডিম থেরাপি তো আর সলিউশন নয়। রায়গঞ্জের মানুষ শান্তিপ্রিয়, সংস্কৃতিপ্রেমী। তাঁরা এটা বোঝেন। তাই সকলে চান, দোষীরা আইনের পথে শাস্তি পাক।'

  • Link to this news (এই সময়)