নবান্নের নির্দেশে রাতারাতি বদলি ২৩ IAS অফিসার: জেলাশাসক থেকে মহকুমাশাসক, কে কোথায়?
দৈনিক স্টেটসম্যান | ১৭ জুলাই ২০২৬
মঙ্গলবার একধাক্কায় বড়সড় প্রশাসনিক রদবদল ঘটাল নবান্ন। কর্মিবর্গ ও প্রশাসনিক সংস্কার দপ্তরের আইএএস সেল থেকে একই দিনে জারি হয়েছে তিনটি পৃথক বিজ্ঞপ্তি, যাতে মোট ২৩ জন আমলার কর্মক্ষেত্র বদলে দেওয়া হয়েছে। রাজ্যপালের অনুমোদনক্রমে জারি হওয়া এই বদলির নির্দেশে সই করেছেন অতিরিক্ত মুখ্যসচিব অনুপ কুমার আগরওয়াল। প্রশাসনিক মহলের একাংশের ব্যাখ্যা, প্রশাসনিক কাজে গতি আনতে এবং জেলাস্তরের কাজকর্ম আরও মজবুত করতেই এই ব্যাপক রদবদল।
এই নির্দেশের জেরে বদলি হয়েছেন পাঁচ মহকুমাশাসক বা এসডিও, যাঁদের অধিকাংশই ২০২২ ও ২০২৩ ব্যাচের তরুণ IAS অফিসার। উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরের এসডিও অঙ্কিতা আগরওয়ালকে পাঠানো হয়েছে পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুরে। হুগলি সদরের এসডিও মধুশ্রীর নতুন কর্মস্থল মুর্শিদাবাদের কান্দি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার আলিপুর সদরের এসডিও রবিকুমার মিনাকে পাঠানো হয়েছে হুগলির শ্রীরামপুরে, আর মালদহ সদরের এসডিও রুশালি ক্লের-কে বদলি করা হয়েছে ইসলামপুরে, যেখান থেকে সরানো হয়েছে অঙ্কিতাকে। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসত সদরের এসডিও ভুবনা প্রণীথ পাপ্পুলার নতুন দায়িত্ব এখন পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুরে।
প্রশাসনিক রদবদলে বিশেষ নজরে পড়েছে মালদহ ডিভিশন। রাজ্য প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বা NSATI-র অতিরিক্ত অধিকর্তা, ২০০১ ব্যাচের অশ্বিনী কুমার যাদবকে প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি পদমর্যাদা বজায় রেখেই দেওয়া হয়েছে মালদহ ডিভিশনের ডিভিশনাল কমিশনারের অতিরিক্ত দায়িত্ব। উল্টো দিকে, মালদহ ডিভিশনের ডিভিশনাল কমিশনার পদে বদলি হয়ে আসা ২০০৯ ব্যাচের আয়েষা রানিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে এনস্যাটি-তেই, অতিরিক্ত মহানির্দেশক হিসেবে।
তৃতীয় বিজ্ঞপ্তিতে ১৬ জন অফিসারের রদবদল ঘটেছে, যার মধ্যে রয়েছেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত আমলা। আবগারি কমিশনার তথা রাজ্য পানীয় নিগমের ব্যবস্থাপনা অধিকর্তা পদে থাকা ২০০৯ ব্যাচের কৌশিক ভট্টাচার্যকে দেওয়া হয়েছে জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের মিশন ডিরেক্টর তথা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দফতরের সচিবের দায়িত্ব। বস্ত্র ও রেশম শিল্প দপ্তরের কমিশনার সুজয় সরকারকে বহাল রাখা হয়েছে তন্তুজের ব্যবস্থাপনা অধিকর্তা পদে, সঙ্গে জুড়েছে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প দপ্তরের অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্বও। নগরোন্নয়ন দপ্তরের সচিব নন্দিনী ঘোষকে পাঠানো হয়েছে মৎস্য দপ্তরে, সঙ্গে বেনফিশের ব্যবস্থাপনা অধিকর্তার অতিরিক্ত ভারও দেওয়া হয়েছে তাঁকে।
তালিকায় নজরকাড়া নাম দিঘার জগন্নাথ ধাম ট্রাস্টের প্রকল্প পরিচালনা ইউনিটের সিইও তথা পূর্ব মেদিনীপুরের অতিরিক্ত জেলাশাসক বৈভব চৌধুরীর। তাঁকে সরিয়ে আনা হয়েছে রাজ্যের ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরে, ডিরেক্টর অফ ল্যান্ড রেকর্ডস অ্যান্ড সার্ভেজ পদে। সঙ্গে ভূমি ও ভূমি সংস্কার এবং সমবায় দপ্তরের অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্বও তাঁর কাঁধে। যেখানে তাঁকে কেন্দ্রীয় সমবায় মন্ত্রকের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজে নজর দিতে হবে।
আসানসোল পুরনিগমেও এসেছে পরিবর্তন। উচ্চশিক্ষা দপ্তরের স্পেশ্যাল কমিশনার পদে সরানো হয়েছে বর্তমান পুরনিগম কমিশনার হিন্দোল দত্তকে। তাঁর জায়গায় নতুন কমিশনার হচ্ছেন হুগলির অতিরিক্ত জেলাশাসক দিলীপ মিশ্র।
উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরের সিনিয়র স্পেশ্যাল সেক্রেটারি তথা জিটিএ-র প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি শামা পারভিনের নতুন দায়িত্ব দমকল ও জরুরি পরিষেবা দপ্তরে। তাঁর জায়গায় জিটিএ-র প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি হচ্ছেন কারিগরি শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন দপ্তরের স্পেশ্যাল সেক্রেটারি স্মৃতিরঞ্জন মহান্তি। অন্য দিকে, দমকল দপ্তরের আগের সিনিয়র স্পেশ্যাল সেক্রেটারি উৎপল ভদ্রকে পাঠানো হয়েছে জনজাতি উন্নয়ন দপ্তরে।
এছাড়াও রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বদল। সমগ্র শিক্ষা মিশনের রাজ্য প্রকল্প অধিকর্তা বিভু গোয়েলকে দেওয়া হয়েছে হাউজিং বোর্ডের ব্যবস্থাপনা অধিকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্ব। আর হাউজিং বোর্ডের আগের ব্যবস্থাপনা অধিকর্তা রাজর্ষি মিত্রকে সরানো হয়েছে জল জীবন মিশনে, জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের সিনিয়র স্পেশ্যাল সেক্রেটারি পদে। স্বাস্থ্য দপ্তরের সিনিয়র স্পেশ্যাল সেক্রেটারি চৈতালী চক্রবর্তীকে পাঠানো হয়েছে কারিগরি শিক্ষা প্রশিক্ষণ দপ্তরে। বাঁকুড়ার অতিরিক্ত জেলাশাসক প্রশান্ত রাজ শুক্লকে দেওয়া হয়েছে রাজ্য চিকিৎসা পরিষেবা নিগম (WBMSCL)-এর ব্যবস্থাপনা অধিকর্তার দায়িত্ব, সঙ্গে স্বাস্থ্য দফতরের অতিরিক্ত সচিবের পদও। গণশিক্ষা প্রসার ও গ্রন্থাগার পরিষেবা দফতরের স্পেশ্যাল সেক্রেটারি রবি প্রকাশ মিনার নতুন ঠিকানা কলকাতা মহানগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা KMDA। হাওড়ার অতিরিক্ত জেলাশাসক শেখর কুমার চৌধুরীকে একই পদে বহাল রেখে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ভূমি সংস্কার এবং উদ্বাস্তু, ত্রাণ ও পুনর্বাসন দফতরের যুগ্ম সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্বও।
একসঙ্গে এমন ব্যাপক এসডিও ও অতিরিক্ত জেলাশাসক পদে বদল হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, হুগলি, দক্ষিণ ও উত্তর ২৪ পরগনা, পশ্চিম মেদিনীপুর, পশ্চিম বর্ধমান এবং পূর্ব মেদিনীপুরের মতো জেলার রোজকার প্রশাসনিক কাজকর্মে সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহলের একাংশ। তবে কিছুদিন পরই কাজে নতুন গতি আসবে বলেই আশাবাদী তথ্যাভিজ্ঞ মহল।