পঞ্চায়েত প্রধানদের হাত থেকে আর্থিক ক্ষমতা কমছে, জানালেন দিলীপ
দৈনিক স্টেটসম্যান | ১৫ জুলাই ২০২৬
গ্রাম পঞ্চায়েতের আর্থিক ক্ষমতার কাঠামোয় বড়সড় পরিবর্তনের পথে হাঁটছে শুভেন্দু অধিকারী সরকার। নির্বাচিত পঞ্চায়েত প্রধানদের হাত থেকে আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সরিয়ে তা সরকারি আধিকারিকদের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করলেন রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়নমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। মন্ত্রীর দাবি, পঞ্চায়েত স্তরে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ কমাতেই এই পদক্ষেপ। সেই লক্ষ্যে খুব শীঘ্রই পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইন, ১৯৭৩-এ সংশোধন আনতে বিধানসভায় বিল পেশ করা হবে বলেও জানান তিনি। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, আসন্ন বিধানসভা অধিবেশনেই এ বিষয়ে সংশোধনী বিল পেশ করা হতে পারে। সেই উদ্দেশে পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইন, ১৯৭৩-এ সংশোধনী আনার প্রস্তুতি চলছে। এই আইন সংশোধন হয়ে গেলে গ্রাম পঞ্চায়েতের আর্থিক ক্ষমতার পরিকাঠামোয় নিশ্চিতভাবেই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে।
মঙ্গলবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়নমন্ত্রী বলেন, ‘যে সব গ্রাম পঞ্চায়েতে কাজের ক্ষেত্রে সমস্যা বা দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগ রয়েছে, সেগুলি দ্রুত খতিয়ে দেখে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।’ পাশাপাশি তিনি স্পষ্ট করে দেন, ভবিষ্যতে গ্রাম পঞ্চায়েতের আর্থিক অনুমোদনের ক্ষমতা আর নির্বাচিত প্রধানদের হাতে থাকবে না। সেই দায়িত্ব দেওয়া হবে সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েতের এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট বা সরকারি আধিকারিকদের।
প্রশাসনিক মহলে বেশ কিছুদিন ধরেই এই পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা চলছিল। মঙ্গলবার মন্ত্রীর ঘোষণার পর সেটা কার্যত স্পষ্ট হয়ে গেল। তাঁর দাবি, ওড়িশা-সহ দেশের অন্য কয়েকটি বিজেপি-শাসিত রাজ্যে যে কাঠামোয় পঞ্চায়েতের আর্থিক ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে, সেই মডেল অনুসরণ করেই পশ্চিমবঙ্গেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলে গ্রাম পঞ্চায়েতের আর্থিক পরিচালনার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তন ঘটবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
বর্তমানে গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানদের হাতেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ক্ষমতা রয়েছে। কর্মসংস্থান প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন, পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের বরাদ্দ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত, উন্নয়নমূলক প্রকল্পে দরপত্র ডাকা, বিল অনুমোদন, অর্থ ছাড়-সহ একাধিক প্রশাসনিক ও আর্থিক বিষয়ে প্রধানের সম্মতি অপরিহার্য। কর্মসংস্থান প্রকল্পে শ্রমিকদের মজুরি সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হলেও সেই অর্থ ছাড়ের প্রশাসনিক অনুমোদনের দায়িত্বও এত দিন প্রধানদের হাতেই ছিল।
সরকারের দাবি, এই আর্থিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের সুযোগ নিয়েই অতীতে একাধিক ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে কর্মসংস্থান প্রকল্পের অর্থ বণ্টন এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগকে ঘিরে বারবার রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। মন্ত্রীর দাবি, তৎকালীন মমতা সরকারের বিরুদ্ধে একের পর দুর্নীতির অভিযোগের জেরেই কেন্দ্রীয় সরকার কর্মসংস্থান প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ ও কাজ বন্ধ রেখেছিল। সে কারণে আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য।
নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে গ্রাম পঞ্চায়েতের এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্টদের হাতেই থাকবে আর্থিক অনুমোদনের যাবতীয় ক্ষমতা। বিল অনুমোদন, অর্থ ছাড়, বিভিন্ন প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দায়িত্বও তাঁদের উপর বর্তাবে। নির্বাচিত প্রধানরা পঞ্চায়েত পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও আর্থিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সরকারি আধিকারিকরাই শেষ কথা বলবেন।
প্রশাসনিক মহলের একাংশের মনে করছে, এই পরিবর্তনের ফলে আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি যেমন বাড়বে, তেমনই সরকারি নিয়ম মেনে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। যদিও বিরোধী শিবিরের একাংশ মনে করছে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের আর্থিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হলে স্থানীয় স্বশাসন ব্যবস্থা সমস্যায় পড়তে পারে। ফলে প্রস্তাবিত সংশোধনী বিল বিধানসভায় পেশ হওয়ার পর তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এখন রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সকলেরই নজর আসন্ন বিধানসভা অধিবেশনের দিকে। সংশোধনী বিল কবে পেশ হয়, ওই বিলে কী কী পরিবর্তন আনা হয় এবং বিলটি আইনে পরিণত হলে গ্রাম পঞ্চায়েতের আর্থিক পরিচালন কাঠামোয় কতটা বদল হয়, সেদিকেই তাকিয়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহল।