• জঙ্গলের অন্তরালে বাংলায় এক টুকরো জনপদ, জনসংখ্যা মাত্র ১৬! গ্রামের ইতিহাস আশ্চর্য করবেই
    প্রতিদিন | ১৩ জুলাই ২০২৬
  • গ্রামের নাম চাঁদপুর। বাংলার মানচিত্রে তার একটি আলাদা পরিচয় আছে, সরকারি নথিতেও রয়েছে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব! অথচ সেই গ্রামের সবটুকু বিস্তার মাত্র দুটি বাড়ি আর একটি মাজার। না আছে পাড়ার পর পাড়া, না আছে সারি সারি বসতি। তবুও একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রাম! যার রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস। সেখানকার বাসিন্দারা আজও নিঃশব্দে বেঁচে রয়েছে বীরভূমের জঙ্গলের বুকের ভিতর। কোথায় এই গ্রাম?

    সিউড়ি শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে, সিউড়ি-১ ব্লকের নগরী পঞ্চায়েত এলাকার পাথরচাপুড়ি মাজার পেরিয়ে জঙ্গলের ভিতর ঢুকে কিছুটা এগোতেই রাস্তার ধারে চোখে পড়ে একটি সাইনবোর্ড-‘চাঁদপুর’। সেখানেই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দুটি বাড়ি, আর একটু দূরে একটি ছোট্ট মাজার। প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে, এ তো সাধারণ কোনও নির্জন বসতি। কিন্তু কাছে গেলেই জানা যায়, এই দুটি বাড়ি আর মাজার নিয়েই গড়ে উঠেছে গোটা একটা গ্রাম। এখানকার বাসিন্দাদের ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, সব সরকারি পরিচয়পত্রেই ঠিকানা লেখা ‘গ্রাম: চাঁদপুর’।

    এই গ্রামের বর্তমান জনসংখ্যা মাত্র ১৬। সবাই একই পরিবারের সদস্য। এই গ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক ইতিহাসও। সেই ইতিহাস তুলে ধরে প্রবীণ বাসিন্দা শেখ আব্দুল ফিরোজ বলেন, বর্ধমানের রাজারা একসময় তাঁর ঠাকুরদা আব্দুল হামিদকে এই জমি দান করেছিলেন। বিনিময়ে বংশপরম্পরায় জঙ্গলের ভিতরের মাজারে প্রতিদিন বাতি জ্বালানোর দায়িত্ব বর্তায় তাঁদের পরিবারের উপর। পরে হামিদের দুই ছেলে মাজারের পাশেই দুটি আলাদা বাড়ি তৈরি করেন। সেই থেকেই জন্ম নেয় চাঁদপুর।

    আজও সেই ঐতিহ্য অটুট। বন দপ্তরের অধীন এই এলাকা। ফলে নতুন করে অন্য কারও বাড়ি তৈরির অনুমতি নেই। আর সেই কারণে গ্রামের সীমানা যেমন আর বাড়েনি, তেমনি বদলায়নি তার চরিত্রও। শেখ আব্দুল ফিরোজ বলেন, ”এই দায়িত্ব আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকে পাওয়া। যতদিন সম্ভব, আমরা তা পালন করে যাব। পঞ্চায়েত ও প্রশাসনের সহযোগিতাও পাই, তাই কোনও অসুবিধা হয় না।” প্রতিদিনই আশপাশের গ্রাম থেকে বহু মানুষ এই অদ্ভুত গ্রাম আর মাজার দেখতে আসেন। দিনের বেলায় তাই নির্জনতার মধ্যেও প্রাণের স্পন্দন টের পাওয়া যায়।

    তবে পরিবারের প্রবীণদের মনে একটাই প্রশ্ন, সময়ের স্রোতে আগামী প্রজন্মও কি একই নিষ্ঠায় এই ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে রাখবে? উত্তর ভবিষ্যতের হাতে। কিন্তু আজও জঙ্গলের নিস্তব্ধতার মাঝখানে চাঁদপুর যেন প্রমাণ করে, একটি গ্রামের পরিচয় তার আয়তনে নয়, তার ইতিহাস আর মানুষের উত্তরাধিকারে। 
  • Link to this news (প্রতিদিন)