• জাহাঙ্গীরের ‘ডান হাত’-এর বিরুদ্ধে কাটমানির অভিযোগ, এবার গ্রামবাসীদের হাতে লক্ষাধিক টাকা ফেরত
    দৈনিক স্টেটসম্যান | ১৩ জুলাই ২০২৬
  • দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভার বেলসিংহা অঞ্চলের বনহোগলা গ্রামে কাটমানি ফেরত দেওয়াকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। অভিযোগ, পলাতক তৃণমূল অঞ্চল সভাপতি গুরুপদ মণ্ডলের স্ত্রী সুচিত্রা মণ্ডল এবং তাঁর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ অনুগামী গ্রামবাসীদের হাতে প্রায় সাড়ে ৮ লক্ষ টাকা ফিরিয়ে দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ ফেরত পাওয়ায় অনেক গ্রামবাসীর মুখে স্বস্তির হাসি ফুটলেও, ঘটনাটি ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক।

    স্থানীয় সূত্রের দাবি, ফলতার প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা জাহাঙ্গীর খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত গুরুপদ মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরে বেলসিংহা অঞ্চলের তৃণমূল সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ, জাহাঙ্গীর খানের নির্দেশেই গুরুপদ মণ্ডল ও তাঁর অনুগামীরা সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে এলাকায় কাটমানি এবং তোলাবাজির একটি চক্র গড়ে তুলেছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, আবাস যোজনা, আমপান ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিপূরণ, বিভিন্ন সরকারি অনুদান এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্পের টাকা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করা হতো। এমনকি স্থানীয়দের দাবি, শুধুমাত্র ১৮৩ নম্বর একটি বুথ থেকেই ২৫ লক্ষ টাকারও বেশি কাটমানি তোলা হয়েছিল। যদিও এই অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

    শুক্রবার বনহোগলা গ্রামে বেলসিংহা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান কাকলি মালির উপস্থিতিতে গুরুপদ মণ্ডলের স্ত্রী সুচিত্রা মণ্ডল, সহদেব মালিক এবং দীপঙ্কর মালিক গ্রামবাসীদের হাতে টাকা তুলে দেন। অভিযোগকারীদের তৈরি তালিকা অনুযায়ী যাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে, তাঁদের একে একে ডেকে অর্থ ফেরত দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে এদিন প্রায় সাড়ে ৮ লক্ষ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

    গ্রামবাসীদের অভিযোগ, আবাস যোজনার একটি বাড়ির জন্য সরকারিভাবে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও সেই টাকা পাইয়ে দেওয়ার নামে অনেকের কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল। কারও কাছ থেকে ৪০ হাজার, কারও কাছ থেকে ৩০ হাজার, কারও কাছ থেকে ২০ হাজার, আবার কারও কাছ থেকে ১৭ হাজার টাকাও নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। শুধু আবাস যোজনাই নয়, আমপান ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বহু পরিবার ধার-দেনা করে এই টাকা দিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন এলাকার বাসিন্দারা।

    স্থানীয়দের একাংশের দাবি, রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিজেপি সমর্থক হওয়ার অভিযোগে ঘরছাড়া হওয়া বহু মানুষ সম্প্রতি এলাকায় ফিরে আসেন। এরপর তাঁরা গ্রামবাসীদের সঙ্গে নিয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন এবং কাটমানির টাকা ফেরতের দাবি তোলেন। অভিযোগ, কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং গুন্ডা দমন আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কাতেই অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও এই দাবির বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি।

    ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক দেবাংশু পান্ডা দাবি করেন, জাহাঙ্গীর খানের নেতৃত্বে গুরুপদ মণ্ডল-সহ বহু তৃণমূল নেতা বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। মানুষের ক্ষোভ এবং আইনের ভয়ে তাঁরা এখন কাটমানির টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হচ্ছেন। দেবাংশু পান্ডার আরও দাবি, ফলতার বিভিন্ন এলাকায় এর আগেও একাধিক তৃণমূল নেতা আবাস যোজনা, আমপান ক্ষতিপূরণ এবং অন্যান্য সরকারি প্রকল্পে নেওয়া কাটমানির টাকা ফেরত দিয়েছেন। তাঁর কথায়, “আগে মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে পারতেন না। এখন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। তাই যাঁরা বেআইনিভাবে টাকা নিয়েছিলেন, তাঁদের সেই টাকা ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।”

    টাকা ফেরত পাওয়া গ্রামবাসী চন্দনা মণ্ডল বলেন, “আগে এলাকায় এমন পরিস্থিতি ছিল যে কোনও সরকারি সুবিধা পেতে গেলে তৃণমূল নেতাদের টাকা দিতে হতো। কারখানায় কাজ করতে হলেও টাকা দিতে হতো, কোনও কাজের অনুমতি পেতেও টাকা লাগত। আমার কাছ থেকেও টাকা নেওয়া হয়েছিল। এখন সেই টাকা ফেরত পেয়েছি। প্রথমে এক লক্ষ টাকা এবং পরে আরও ২০ হাজার টাকা হাতে পেয়েছি। আগে প্রতিবাদ করার সাহস ছিল না, এখন মানুষ নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারছেন।”

    অন্যদিকে বেলসিংহা গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল প্রধান কাকলি মালি বলেন, যাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সেই তালিকা অনুযায়ী ধাপে ধাপে গ্রামবাসীদের টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা চাই স্বচ্ছতার সঙ্গে এলাকার মানুষের পাশে থাকতে। যাঁরা টাকা নিয়েছিলেন, তাঁরা নিজেরাই সেই টাকা ফিরিয়ে দিচ্ছেন। এলাকার মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাই আমাদের লক্ষ্য।”

    ঘটনাটি সামনে আসার পর ফলতা জুড়ে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, এই ঘটনা প্রমাণ করছে যে সরকারি প্রকল্পে কাটমানির অভিযোগ ভিত্তিহীন ছিল না। অন্যদিকে তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের বক্তব্য, মানুষের অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়েছে এবং যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের মাধ্যমে অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এই ঘটনায় কোনও সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।

    উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সাম্প্রতিক সময়ে ফলতা এলাকায় কাটমানি ফেরতের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। বিভিন্ন গ্রামে সরকারি প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার খবর প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে বিরোধীরা বিষয়টিকে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরলেও শাসকদলের একাংশ বলছে, মানুষের অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

    তবে গুরুপদ মণ্ডল, জাহাঙ্গীর খান বা তাঁদের অনুগামীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগগুলির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাইও সম্ভব হয়নি। তবুও বনহোগলা গ্রামে গ্রামবাসীদের হাতে সাড়ে ৮ লক্ষ টাকা ফেরত দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফলতার রাজনীতি যে নতুন মোড় নিয়েছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আগামী দিনে এই ঘটনায় প্রশাসনিক তদন্ত বা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া কোন দিকে গড়ায়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের।
  • Link to this news (দৈনিক স্টেটসম্যান)