মাত্র ১৭-তেই নিখোঁজ, এক যুগ পর সোনার পদক নিয়ে ঘরে ফিরল কোচবিহারের মূক ও বধির মেয়ে
প্রতিদিন | ১২ জুলাই ২০২৬
কেটে গেছে ১২ বছর। ‘হারিয়ে যাওয়া’ মেয়ের ঘরে ফেরার আশার আলো যখন প্রায় ক্ষীণ হয়ে আসছিল। ঠিক তখনই ঘটল মিরাকেল! একচালা টিনের ঘরে ফিরে এল মায়া। মা-বাবার চোখে কোণে আনন্দের অশ্রু চিকচিক করছে। কোথায় ছিল, কীভাবে ফিরল, হাজারো প্রশ্ন ভিড় করে আসছে মনে। বার্লিন ফেরত মেয়ে ইশারাতেই মা-বাবাকে বুঝিয়ে দিলেন একযুগের সংগ্রামের কথা।
কোচবিহারের মায়া বর্মন। কোচবিহারের বক্সিরহাট থানা এলাকার বালাকুঠি গ্রামের বাসিন্দা। জন্ম থেকেই কানে শোনে না, বলতেও পারে না। বাবা খেতমজুরি করে সংসার চালাতেন। হঠাৎই একদিন মেয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। সালটা ২০১৪। ইশারায় মায়া জানালেন, পেটের টানে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছিলেন। স্টেশনে গিয়ে না জেনেই ট্রেনে উঠে পড়েছিলেন। সেই ট্রেনেই উত্তর দিনাজপুর চলে যান। অচেনা জায়গায় গিয়ে পড়ে অসহায় মায়া স্টেশনে চত্বরেই ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করলেও মূক-বধির মেয়ের কাছ থেকে বাড়ি বা অন্য কোনও তথ্য পাওয়াও সম্ভব হয়নি। একরকম বাধ্য হয়েই সরকারি শিশু কল্যাণ কমিটির মাধ্যমে মায়াকে হাওড়ার বাগনানের একটা সরকারি হোমে পাঠানো হয়েছিল সে সময়। ১২বছর সেখানেই কিশোরী থেকে তরুণী হয়ে ওঠা মায়ার।
অন্যদিকে নুন আনতে পান্তা ফুরোনো সংসারে হারানো মেয়েকে খুঁজে আনার বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় অর্থ। পাঁচ ভাইবোনের সবার বড় মায়া। সে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে এদিক ওদিক ঘুরতে থাকলেও মায়ার খোঁজ মেলেনি। মেয়ের ফেরার আশা নিভতে নিভতেও যেন হঠাৎ দপ করে জ্বলে উঠল। সপ্তাহ দুয়েক আগেই বাবা মনোজ বর্মনের কাছে ফোন আসে। বক্সিরহাট থানার ওসি কপিলদেব রায় ফোন করে মনোকে জানান, তাঁর সেই মেয়েকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। আর এই খবর পাওয়া মাত্রই গোটা আনন্দে আত্মহারা পরিবার। এলাকার স্কুলশিক্ষককে সঙ্গে করে মনো ছোটেন হোমে মেয়েকে আনতে। সেখানে যেতেই তাজ্জব। হোম কর্তৃপক্ষ মনোকে দেখাতে থাকেন একটার পর একটা পদক। এ সব গুলোই নাকি মায়ার। ভলিবলে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জেতা। গত কয়েক বছর ধরে দেশ-বিদেশের ভলিবল প্রতিযোগিতায় খেলেছেন। ২০২৩ সালে জার্মানির বার্লিনে একটি স্পেশ্যাল অলিম্পিক্স ইভেন্টেও দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন মায়া। জিতেছেন সোনার পদক।
কীভাবে মায়ার ঠিকানার খোঁজ পেল হোম কর্তৃপক্ষ? জানা গিয়েছে, সম্প্রতি মায়ার আধার কার্ড তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই মতো নির্দিষ্ট কেন্দ্রে গিয়ে আঙুলের ছাপ দেন মায়া। সেই আঙুলের ছাপের সূত্র ধরেই আধার কর্তৃপক্ষ জানতে পারেন বহপবছর আগেই তাঁর আধার কার্ড হয়ে গিয়েছিল। আধারের ঠিকানা দেখামাত্রই সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করে মায়াকে বাড়ি ফেরানোর ব্যবস্থা করে হোম কর্তৃপক্ষ। আদালতের অনুমতি নিয়ে গত বুধবার মায়াকে বাগনান থেকে ফেরানো হয় কোচবিহারের বাড়িতে।