বর্ষা শুরু হতেই কোথাও রেনকোট, কোথাও ছাতা কেনার ব্যস্ততা। এটাই বর্ষার পরিচিত ছবি। কিন্তু পূর্ব বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট ব্লকের আতকুলা গ্রামের বর্ষার ছবি সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে বর্ষা মানেই বাঁশ কাটার তাড়া, আর বাড়ির ভিতরে উঁচু করে বাঁশের মাচা তৈরির প্রস্তুতি। শুনতে অবাক লাগলেও, এটাই এই গ্রামের বাস্তব ছবি। বর্ষা এলেই প্রায় প্রতিটি বাড়িতে তৈরি হয় কয়েক ফুট উঁচু বাঁশের মাচা। কারণ গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গিয়েছে অজয় নদ। নদীর জল বাড়লেই প্লাবিত হয়ে যায় গোটা গ্রাম। বাড়ির উঠোন থেকে ঘরের ভেতর, সবই ডুবে যায় জলের তলায়। তখন স্বাভাবিক জীবন কার্যত থমকে যায়।
গ্রামবাসী ননীচূড়া ঘোষ বলেন, “বর্ষাকালে অজয় নদীর জল বাড়লেই আমাদের গ্রাম ডুবে যায়। আমাদের গ্রামের যে বাঁধ রয়েছে, সেই বাঁধ আর ভাল অবস্থায় নেই। প্রায় নদীর সঙ্গে সমান হতে চলেছে। তাই নদীর জল বাড়লেই বাঁধ উপচে আমাদের গ্রামে জল ঢুকে পড়ে এবং গোটা গ্রাম ভেসে যায়। প্রতিবছর আমাদের এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আজও কোনরকম সমাধান হয়নি। তাই আমরা সকলেই দ্রুত বাঁধ সংস্কারের দাবি জানাচ্ছি। বর্ষাকালে যখন গোটা গ্রাম জলে ডুবে যায় তখন বাসের মাচা তৈরি করে সেই মাচার উপরেই আমাদের দিন কাটাতে হয়।” গ্রামবাসীদের অভিযোগ, এই দুর্ভোগের মূল কারণ অজয় নদীর বাঁধের বেহাল দশা। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে বাঁধে নতুন করে মাটি ফেলা হয়নি।
কোথাও বাঁধের উচ্চতা কমে গিয়েছে, কোথাও আবার ভাঙা অংশ আজও সংস্কার করা হয়নি। ফলে বর্ষায় নদীর জল বাড়লেই বাঁধ উপচে কিংবা ভাঙা অংশ দিয়ে জল ঢুকে পড়ে আতকুলা গ্রামে। ২০০০ সালের ভয়াবহ বন্যায় বাঁধের একটি অংশ ভেঙে গিয়েছিল। গ্রামবাসীদের দাবি, এত বছর কেটে গেলেও সেই অংশের স্থায়ী মেরামত আজও হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষাতেই আতঙ্কে দিন কাটে গ্রামের মানুষের। বন্যার কারণে ভিটে মাটি হারিয়ে নতুন করে ঘর তৈরি করতে হয়েছে বহু বাসিন্দাকেই। গ্রামবাসী মৃণাল কান্তি ঘোষ বলেন, “দীর্ঘদিন আমাদের এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় বহুবার জানানোর পরেও আজও কোনও সমাধান মেলেনি। বর্ষাকালে আমরা একরকম ঘরবন্দী হয়ে পড়ি, খাওয়া দাওয়া তো দূরের কথা একটু খাবার জল পেতেও চরম সমস্যা হয়।
আমরা সকলেই প্রশাসনের কাছে এই বাঁধ সংস্কারের জন্য আর্জি জানাচ্ছি।” যাঁদের সামর্থ্য রয়েছে, তাঁরা বর্ষার সময় পরিবার নিয়ে অন্যত্র চলে যান। কিন্তু যাঁদের যাওয়ার উপায় নেই, তাঁদের জলবন্দি হয়েই দিন কাটাতে হয়। প্রায় ২০০টিরও বেশি পরিবারের বাস এই গ্রামে। ভোটার সংখ্যা ৪৮৮। তাঁদের অভিযোগ, বহুবার পঞ্চায়েত থেকে প্রশাসনের কাছে বাঁধ সংস্কারের আবেদন জানানো হলেও মেলেনি স্থায়ী সমাধান। আশ্বাস মিলেছে বারবার, কিন্তু শুরু হয়নি সংস্কারের কাজ। ইরিগেশন দফতর থেকেও নাকি বহুবার পরিদর্শন করা হয়েছে এই এলাকা, তবে সমাধান আজও অধরা। তাই আতকুলা গ্রামের মানুষের একটাই দাবি অজয় নদীর বাঁধ দ্রুত সংস্কার করা হোক। প্রতি বছরের বন্যা-দুর্ভোগ থেকে স্থায়ী মুক্তি পাক তাঁদের গ্রাম।