উত্তরবঙ্গে রেকর্ড গড়ে বাঁচল বছরে শূন্যে নামল লেপার্ডের পথ দুর্ঘটনা, রক্ষা পেল ৮ শাবকও
News18 বাংলা | ০৯ জুলাই ২০২৬
: এক সময় যেখানে ঘোষপুকুর রেঞ্জে প্রায় প্রতি বছরই ১০ থেকে ১৫টি লেপার্ড সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাত, সেখানে গত এক বছরে ছবিটা সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শেষবার একটি লেপার্ডের রোড কিলের ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার পর থেকে আর একটি ঘটনাও ঘটেনি। বন দফতরের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত প্রচার এবং ‘ব্রেক ফর ওয়াইল্ডলাইফ’ অভিযানের ইতিবাচক প্রভাবেই এই সাফল্য এসেছে। বর্তমানে ঘোষপুকুর রেঞ্জে রাজ্যের মধ্যে অন্যতম বেশি সংখ্যক লেপার্ডের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বনাঞ্চলের পাশাপাশি চা-বাগান ও সংলগ্ন এলাকায়ও তাদের বিচরণ বেড়েছে। ফলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করতে বনকর্মীদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শুধু পূর্ণবয়স্ক লেপার্ড নয়, তাদের শাবকদের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও নজির গড়েছে ঘোষপুকুর রেঞ্জ। চলতি বছরে অন্তত পাঁচটি পৃথক ঘটনায় মোট আটটি লেপার্ড শাবককে উদ্ধার করে নিরাপদে তাদের মায়ের সঙ্গে পুনর্মিলন ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন বনকর্মীরা। এর ফলে একটিও শাবককে মায়ের সঙ্গ হারাতে হয়নি। বন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ঘোষপুকুর রেঞ্জে কোনও লেপার্ড শাবকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সাফল্য ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলের লেপার্ড সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে এবং শাবকদের মৃত্যুহার কার্যত শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
লেপার্ড সংরক্ষণের পাশাপাশি অন্যান্য বন্যপ্রাণ রক্ষাতেও সমানভাবে সক্রিয় ঘোষপুকুর রেঞ্জ। প্রতি মাসে প্রায় একশোর কাছাকাছি বিভিন্ন প্রজাতির সাপ উদ্ধার করে নিরাপদে প্রাকৃতিক পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া হয়। এছাড়া আহত বা অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন প্রজাতির পাখির চিকিৎসার ব্যবস্থা করে সুস্থ করে আবার প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। গত কয়েক মাসে অসংখ্য সাপ, পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণ উদ্ধার করে তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বন দফতর।
এ প্রসঙ্গে ঘোষপুকুর রেঞ্জের রেঞ্জার সমবর্ত সাধু বলেন, “এক সময় এই এলাকায় অতিরিক্ত গতিতে যান চলাচলের কারণে প্রায়ই লেপার্ডের মৃত্যুর ঘটনা ঘটত। কিন্তু ‘ব্রেক ফর ওয়াইল্ডলাইফ’ কর্মসূচি, নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচার এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতার ফলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। গত এক বছরে একটি লেপার্ডও রোড কিলের শিকার হয়নি। একইভাবে লেপার্ডের শাবকদের ক্ষেত্রেও আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছি। যেখানে শাবকদের দেখা গিয়েছে, সেখানেই নজরদারি চালিয়ে তাদের নিরাপদে মায়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু উদ্ধার নয়, প্রতিটি বন্যপ্রাণীকে তার স্বাভাবিক পরিবেশে নিরাপদে ফিরিয়ে দেওয়া।”
বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে ঘোষপুকুর রেঞ্জের এই ধারাবাহিক সাফল্য এখন রাজ্যের অন্যান্য বনাঞ্চলের কাছেও একটি ইতিবাচক উদাহরণ হয়ে উঠেছে। বনকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টা, প্রশাসনের উদ্যোগ এবং স্থানীয় মানুষের সচেতন অংশগ্রহণের ফলে লেপার্ডসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারা বজায় থাকলে আগামী দিনে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত আরও কমবে এবং উত্তরবঙ্গে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে।