নীলাঞ্জন দাস
জানুয়ারি মাসের হাড় কাঁপানো শীত। সঙ্গে ঘন কুয়াশায় ঢেকেছে গোটা এলাকা। সীমান্ত এলাকায় তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। মাঝরাতে হঠাৎই কান ফাটানো একটা ধাতব আওয়াজ। কাঁটাতারের কাছে এই শব্দ অবশ্য অনেকটাই চেনা এলাকাবাসীর। তবে স্থানীয়রা বুঝে উঠতে পারেননি, ঠিক কী চলছে। ততক্ষণে এক খুনের আসামিকে গুলি করে ঘায়েল করেছে পুলিশ। ঠিক এক বছর আগে পুলিশের এনকাউন্টারে জখম হয় সাজ্জাক। উত্তর দিনাজপুরের গোয়ালপোখরের কিচকটোলা এলাকায় সীমান্ত পেরিয়ে পালানোর সময়ে পুলিশের গুলিতে জখম হয় সে। পরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে মারা যায়।
২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর দুর্গাপুজোর সময়ে নবমীর রাতে করণদিঘি বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় দোকানের মধ্যেই করণদিঘির খিকরিটোলার বাসিন্দা পোল্ট্রি ফার্মের মালিক সুবেশ দাসকে গুলি করে খুন করা হয়েছিল। এই ঘটনায় গ্রেপ্তার হয় সাজ্জাক আলম ও তার সহযোগীরা। সুবেশ দাসেরই ফার্মে কাজ করতো সাজ্জাক। এই খুনের ঘটনায় সাজ্জাক ও তার বোন মর্জিনা বেগম-সহ আরও পাঁচজন গ্রেপ্তার হয়। সাজ্জাকের নামে এই খুন ছাড়াও গোয়ালপোখরের একটি ছিনতাইয়ের ঘটনার মামলা ছিল। সুবেশ দাস খুনের ঘটনায় পরে মর্জিনা ও শেখ নাদিমের স্ত্রী জামিনে মুক্ত হলেও সাজ্জাক ও তার সঙ্গী শেখ নাদিম, মর্তুজ আলম, রাহিদ শেখ ও নুর আলম জেলেই ছিল।
মামলা চলাকালীন ২০২৫ সালের ১৫ই জানুয়ারি ইসলামপুর মহকুমার গোয়ালপোখর থানার পাঞ্জিপাড়া এলাকায় বিচারাধীন সাজ্জাক আলমকে ইসলামপুর থেকে রায়গঞ্জ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। রাস্তায় টয়লেট করার ছুতোয় পুলিশের গাড়ি থেকে নেমে লুকিয়ে রাখা আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি চালিয়ে দুই পুলিশকর্মীকে জখম করে পালিয়ে যায় সাজ্জাক। ঘটনায় রাজ্য জুড়ে শোরগোল পড়ে যায়। এই ঘটনার পর সরজমিনে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে যান তৎকালীন রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার পরে ডিজির বক্তব্য ছিল, ‘সাধারণ মানুষের সুরক্ষার স্বার্থে পুলিশ থাকে। কোনও ক্রিমিনাল যদি পুলিশকে লক্ষ্য করে একটা গুলি চালায়, আমরা ৪টে গুলি চালাব। এই ব্যাপারে আমরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।’
ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ সাজ্জাকের পালানোর ব্যাপারে পার্শ্ববর্তী বিহার থেকে সংলগ্ন বাংলাদেশ সীমান্তকেই নজরদারির ক্ষেত্রে টার্গেট করে। কারণ এই সীমান্ত এলাকাতেই সাজ্জাককে পালাতে সাহায্যকারী আব্দুল হুসেনের শ্বশুরবাড়ি। ফলে একেই শেল্টার হিসেবে ব্যবহার করে সাজ্জাককে বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে সাহায্য করার প্ল্যান করতে পারে বলে পুলিশের সন্দেহ দানা বাঁধে। সেইমতো দিনরাত নজরদারি শুরু হয়। ২০২৫ সালের ১৭ই জানুয়ারি, শনিবার ভোররাতে গোপনসূত্রে পুলিশ খবর পায়, গোয়ালপোখরের কিচকটোলা এলাকায় সাজ্জাক লুকিয়ে আছে।
এর পরেই শুরু হয় পুলিশের অভিযান। সাজ্জাককে ঘিরে ফেলতেই সে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পাল্টা পুলিশও কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে সাজ্জাক গুলিবিদ্ধ হয়। মারাত্মক আহত অবস্থায় তাকে স্থানীয় লোধন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসার কিছুক্ষণ পর সে মারা যায়। সাজ্জাকের পায়ে, বুকের বাঁ দিকের উপরে ও পিঠে মিলিয়ে মোট ৩টি গুলি লাগে। ময়নাতদন্তের পর পুলিশের পক্ষ থেকে সাজ্জাকের দেহ তুলে দেওয়া হয় পরিবারের হাতে।
বারুইপুরের ঘটনায় সেই দিনের পুলিশের এনকাউন্টারের স্মৃতি মনে পড়েছে করণদিঘির ছোট সোহার এলাকার বাসিন্দাদের। স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য মাঝারুল ইসলাম এই সময় অনলাইনকে বলেন, ‘বারুইপুরের পুলিশের এনকাউন্টারের ঘটনার কথা শুনে সাজ্জাক এনকাউন্টারের কথা মনে পড়ছে ঠিকই, তবে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়াটা অবশ্যই জরুরি। যে ক্রাইম করবে, তার তো সাজা হবেই। সাজ্জাকের এনকাউন্টারের পর থেকেই এলাকায় শান্তি বজায় আছে।’
করণদিঘি পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য রেজাউল করিম বলেন, ‘সাজ্জাকের পরিবারের লোকেরা দীর্ঘদিন পলাতক ছিল। তবে এখন ওরা নিজেদের বাড়িতেই থাকে। তবে গ্রামবাসীদের সঙ্গে খুব একটা ওঠা-বসা নেই। বারুইপুরের এনকাউন্টারের ঘটনা দেখে এই সাজ্জাক এনকাউন্টারে ঘটনা মনে পড়ছে ঠিকই। তবে দুই ক্ষেত্রেই পুলিশ একেবারে ঠিক কাজ করেছে।’ যদিও সাজ্জাকের পরিবারের করো বক্তব্য মেলেনি।