• শিশু নির্যাতন: মানসিক বিকার নাকি সামাজিক অবক্ষয়?
    আজকাল | ০৮ জুলাই ২০২৬
  • গোপাল সাহা 

    সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে কাগজটা খুললেই বুকটা হু হু করে ওঠে, কেঁদে ওঠে মন। চারিদিকে একাধিক শ্লীলতাহানির ঘটনা বা যৌন নির্যাতন, আবার কখনও গণধর্ষণের মত বর্বরতা। তাই দেখে মনটা অত্যন্ত অশান্ত হয়ে যায়। সামাজিক এবং একই সঙ্গে মানবিক উভয়ই যেন দিনে দিনে চরম অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে। রাজ্যে পালাবদলের পরে কঠিন থেকে কঠিন পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ালেও মানুষের মধ্যে হিংসার প্রবণতা কিছু মাত্রও কমেনি। কিন্তু কেন? এমনটাই প্রশ্ন উঠছে সমাজ জীবনে প্রতিটি মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের মধ্যে। 

    গত দু’দিনের মধ্যে রাজ্যজুড়ে নারকীয় ঘটনা ঘটেছে একাধিক জায়গায়। নাবালিকা ও শিশু গণধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটেছে রাজ্যের বেশ কিছু অংশে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মালদা, ক্যানিং ও বারুইপুরের নৃশংস ঘটনা। যা মধ্যযুগীয় বর্বরতার থেকেও ঘৃণ্যতম ঘটনা। যা দেখে শহর থেকে গ্রাম সারা বাংলা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। যার মধ্যে বারুইপুরের ঘটনা অতীব নৃশংস ও মধ্যযুগীয় বর্বরতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। বারুইপুরের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত আনন্দ সর্দার মদ্যপ অবস্থায় নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুন করে বলে অভিযোগ। 

    বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্তি একটা বড় কারণ এই ধরনের যৌন নির্যাতন অপরাধের জন্য। যুবসমাজের মধ্যে প্রবল পরিমাণে মাদকদ্রব্যের নেশায় বুদ হয়ে থাকা। যার ফলে অপরাধের প্রবণতা ও মানসিক সুস্থ চিন্তার অভাব বাড়ছে প্রবল পরিমাণে। এই ধরনের নৃশংসতা প্রমাণ করে মানুষের মধ্যে সুস্থ চিন্তাভাবনার কতটা অভাব ঘটেছে। রাজ্য প্রশাসনের তৎপরতা বাড়লেও মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ল কি? তবে চিকিৎসক বিশেষজ্ঞদের মতে এই ধরনের বিকৃত চিন্তাভাবনা এক ধরনের অসুস্থতার লক্ষণ। যার নাম ‘প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার’।

    ‘প্যারাফিলিক ডিজঅর্ডার’ কী? 

    এটি এমন এক মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যা, যা অস্বাভাবিক চিন্তা, কল্পনা বা আচরণের প্রতি তীব্র যৌন উত্তেজনার সৃষ্টি করে। এই তীব্র এবং পুনরাবৃত্তিমূলক আকাঙ্ক্ষাগুলি যখন ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনে মানসিক যন্ত্রণা, অক্ষমতা সৃষ্টি করে, অন্যের ক্ষতি বা সম্মতির অভাব থাকে, তখনই এটিকে ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। 

    লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্য

    এই বিষয়ে আজকাল ডট ইন-এর মুখোমুখি হয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নীলাঞ্জন চন্দ্র বলেন,  “নাবালিকাদের ওপর এ ধরনের হিংসাত্মক অপরাধ অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বেদনাদায়ক একটি বিষয়। এ ধরনের অপরাধীদের মানসিক অবস্থা সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন হয়। অনেকের মতে, এদের মধ্যে ‘অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার’ বা ‘প্যারাফিলিক ডিজঅর্ডার’-এর মতো মানসিক সমস্যা থাকতে পারে। এর ফলে তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা, অন্যের প্রতি সহানুভূতির অভাব এবং সামাজিক নিয়মের প্রতি উদাসীনতা দেখা দিতে পারে। তবে প্রতিটি ঘটনা আলাদা এবং এর নেপথ্যে নানা জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ কাজ করতে পারে। তাই বলে এই ধরনের অপরাধীদের চিকিৎসার নামে ফেলে রাখলে হবে না। কঠিন থেকে কঠিনতর সাজা হওয়াও খুবই জরুরী।”

    মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, “নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুন, এই অসুস্থ মর্ষকাম সভ্য সমাজের বিকৃত অবয়বের পিছনে রয়েছে গভীর মনস্তত্ব। অপরাধীর মধ্যে থাকে বহুবিধ সমস্যা। জিন বা ক্রোমোজোমে লুকিয়ে থাকে অপরাধবিজ্ঞানের চাবিকাঠি। বড় হয়ে ওঠার সময়ে অত্যাচারিত হওয়া, অভিভাকদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েনের দেখে বিকৃত হয়ে ওঠে শৈশব। তারপরে অধঃপতনের পথে এগিয়ে বয়ঃসন্ধিতে আসে কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডার ও অ্যান্টিসোশাল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার। আর এর ফলেই হারিয়ে ফেলে মানবিক বোধ, আসক্ত হয়ে পড়ে ভয়ঙ্কর নেশায়। আর তারপরেই ঘটায় সামাজিক এই ধরনের ঘৃণ্য নিয়ে অপরাধ। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে।”

    এই বিষয়ে বিশিষ্ট সমাজবিদ অরিজিৎ মিত্র বলেন, “এই অপরাধকে দমন করতে গেলে মূল থেকে নির্মূল করতে হবে। শুধু আইন প্রণয়ন কিংবা আইনের কড়াকড়ি করলেই হবে না। শুধু কঠিন থেকে কঠিন সাজা দিলেই এর সমাধান হবে না। সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। বিজ্ঞাপন বা নানারকম টিভির প্রোগ্রামে যে ধরনের চলচ্চিত্র দেখানো হয় ব্যবসা বাড়ানোর বা মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য যৌন উত্তেজনামূলক, তা বন্ধ করতে হবে। এই সকল কারণে মানুষের মধ্যে বিকৃতি তৈরি হচ্ছে। এই বিষয়ে সরকারের ও আলোকপাত করা উচিত। একই সঙ্গে মানুষ সচেতন ও সজাগ না হলে এই ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এছাড়া সমাজধ্যম ও এই কারণে অনেক অংশে দায়ী।” 

    এই বিষয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংযুক্তা দে বলেন, “বারুইপুরের ঘটনা কোনও বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়। এই ঘটনা সামাজিক অবক্ষয়ের লক্ষণ এবং একই সঙ্গে সামাজিকভাবে যে কতটা আমরা অবনতির পথে এগিয়েছি তার স্পষ্ট চিত্র। ২০১২ সালের পকসো আইন নাবালিকাদের জন্য অনেক বেশি সহযোগিতা করেছে। নাবালিকাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া বহু সত্যি ঘটনার সঠিক তথ্যর ফলে এই ধরনের অমানবিক ঘটনা সামনে এসেছে এবং রিপোর্টও হয়েছে। আর এই ধরনের ঘটনা শিশু কিংবা নাবালিকাদের উপর বাড়ার বড় কারণ, ১৮-উর্ধ্ব মেয়েরা অনেক বেশি সচেতন হয়েছে বিভিন্ন শিক্ষামূলক সচেতনতার কারণে। সেই জায়গায় এই নাবালিকা বা শিশুরা অনেক বেশি পিছিয়ে বা দুর্বল। আর তারই সুযোগ নিয়ে এই নির্মম ঘটনা ঘটছে। এছাড়াও সমাজমাধ্যমের কারণে বাচ্চাদের দিয়ে তাদের অভিভাবকরা নানা রকম রিল বা ভিডিও বানানোর ফলে অনেক বেশি এক্সপোজ হয়ে পড়ছে বাচ্চারা। যা শীঘ্রই বন্ধ হওয়া উচিত। কারণ, বাবা মায়েদের এই ধরনের সখ বা আচরণের জন্য কন্যা শিশু বা নাবালিকারা ‘পিডোফাইল’ অর্থাৎ শিশুকামী (শিশুদের উপর যৌন আকর্ষণ)-এর শিকার হন। যার পরিণতি বর্তমান পরিস্থিতি বা বারুইপুরের মত ঘটনা বারবার সামনে আসা। শুধু আইনকে কঠিন করা বা প্রশাসনের কড়া ব্যবস্থা নিলেই হবে না। সমাজকেও সচেতন হতে হবে।”
  • Link to this news (আজকাল)