• মাটির মূর্তির ‘জীবন্ত’ সংস্করণ, ঘূর্ণির পুতুল পেল GI স্বীকৃতি, কী বলছেন শিল্পীরা?
    এই সময় | ০৬ জুলাই ২০২৬
  • সামনে মাটির ঝুড়িতে সাজানো আনাজ। গ্রামের এক বধূ সেই সব্জি বিক্রি করছেন। পরনে হাতার কাছে কল্কা আঁকা ব্লাউজ, সবুজ রঙের ছাপা শাড়ি। পাশেই কয়েকজন বৈষ্ণব সাধু নাম সংকীর্তন করছেন। প্রত্যেকের মাথায় রসকলি। গায়ে উড়ছে গেরুয়া কাপড়, পরনে সাদা ধুতি। তার ঠিক পাশেই এক কৃষক কাঁধে লাঙল নিয়ে হেঁটে চলেছেন। পেশীবহুল মেঠো শরীর। কাঁধে গামছা ফেলা। মাথায় বেতের টুপি। ভাবছেন, এ কেমন জায়গা? কোথায় মেলে এমন দৃশ্য? অনেকেরই বাড়ির শো-কেসে পরপর সাজানো এই পুতুলের সারি দেখতে পাবেন। নামে পুতুল, দেখতে অবিকল মানুষের মতো। এতটাই নিপুন, এতটাই নিখুঁত সেই শিল্পকর্ম। এআই প্রযুক্তিতে ‘ন্যানো ব্যানানা’ টুলের মাধ্যমে মিনিয়েচার তৈরির কয়েক যুগ আগে থেকেই বাংলার মাটির গন্ধমাখা এই শিল্পকর্ম পৌঁছে গিয়েছিল ঘরে ঘরে, পড়ার টেবিলে বা শো-কেসের মাথায়। ‘ভানু’র মতো অনেক বিক্রেতা মেলায় মেলায় গিয়ে গাইতেন, ‘পুতুল নেবে গো পুতুল…। ’ কৃষ্ণনগরের সেই ঘূর্ণি মাটির পুতুল পেল GI স্বীকৃতি।

    রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের শহর কৃষ্ণনগর। রাজদরবারে রসিক গোপাল ভাঁড়ের গল্প আজ লোকের মুখে মুখে ঘোরে। তবে কৃষ্ণনগর বিশ্বজনীন হওয়ার আরও এক উপাদান হলো এই পুতুল। জীবন্ত মানুষের অপূর্ব মৃন্ময়ী সংস্করণ। নামকরণ হয় জায়গায় নাম অনুসারেই। কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণির পাশ দিয়ে বয়ে চলা জলঙ্গী নদীর এঁটেল দিয়ে তৈরি হয় এই পুতুল। একটি মূর্তির কারুকাজে লুকিয়ে আছে কয়েকশো বছর ধরে হাজারও শিল্পীর পরিশ্রম, প্রতিভা ও অধ্যাবসায়। মাটি দিয়ে তৈরি একটি ছোট মূর্তিকে জীবন্ত করে তোলার জেদ।

    এই শিল্পকর্মের জন্য রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছেন বহু শিল্পী। খ্যাতি অর্জন করেছে অনেকে। কিন্তু কোথাও একটা যেন খামতি ছিল। পৃথিবীর সমস্ত সপ্রতিভ মৌলিক জিনিসের ঠুনকো নকল তৈরি হতেও সময় লাগে না। ঘূর্ণি পুতুলের ক্ষেত্রেও অন্যথা হয়নি। বাজারে এ হেন বহু পুতুল বিক্রি করা হতো কৃষ্ণনগরের নাম নিয়ে। তাই কোথাও একটা ‘হলমার্ক’-এর দরকার ছিল। অবশেষে মিলল সেই পরচিয়, জিআই ট্যাগ।

    ঘূর্ণির মোড় শিবতলার রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী সুবীর পাল বলেন, ‘আজকে আমরা খুবই আনন্দিত এবং গর্বিত। কারণ জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য অনেক লড়াই করেছি। আজ দু’চোখের স্বপ্ন পূরণ হলো। এই জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার কারণে মৃৎশিল্পীদের পুতুলের চাহিদা আরও বাড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে এ বার থেকে কৃষ্ণনগরের শিল্পীদের হাতে তৈরি পুতুলে থাকবে জিআই ট্যাগ।’

    তাঁর দাবি, একদিকে যেমন শিল্পীদের পরিচিতি বাড়বে। অন্য দিকে মুনাফা হবে ব্যবসায়। শিল্পী আরও জানান, এখন থেকে কৃষ্ণনগরের পুতুল নকল করা মুশকিল। জিআই স্বীকৃতির জন্য বন্ধ হবে কালো বাজারি। আশায় বুক বাঁধছেন শিল্পীরা।

  • Link to this news (এই সময়)