আজকাল ওয়েবডেস্ক: আজ ৫ই জুলাই। ঠিক ১৪ বছর আগে, ২০১২ সালের এই অভিশপ্ত দিনেই কলকাতার গোবরডাঙা স্টেশনে নৃশংসভাবে খুন হতে হয়েছিল নির্ভীক প্রতিবাদী শিক্ষক বরুণ বিশ্বাসকে। দেখতে দেখতে এতগুলো বছর পার হয়ে গেলেও সুটিয়ার সেই লড়াকু নায়কের খুনের প্রকৃত বিচার মেলেনি আজও। খুনের নেপথ্যে থাকা মূল ষড়যন্ত্রকারী এবং প্রকৃত অপরাধীরা এখনও শাস্তি পায়নি। এই ক্ষোভ ও বিচারের দাবিতেই আজ বরুণ বিশ্বাসের কর্মক্ষেত্র, কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশন (মেন)-এর সামনে জড়ো হয়েছিলেন সমাজকর্মী, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে স্কুলের বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্ররা।
‘বরুণ বিশ্বাস স্মৃতিরক্ষা কমিটি’র উদ্যোগে আজ স্কুলের সামনে এক শ্রদ্ধাজ্ঞাপন ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। বরুণবাবুর প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে তাঁর সংগ্রামী চেতনাকে স্মরণ করার পাশাপাশি উপস্থিত সকলেই সরব হন দ্রুত বিচারের দাবিতে। এই স্মরণসভা থেকেই কমিটির পক্ষ থেকে ‘বরুণ বিশ্বাস হত্যার বিচার চাই’ শিরোনামে একটি নতুন পোস্টার প্রকাশ করা হয়েছে। বরুণবাবুর স্মৃতি বিজড়িত সুটিয়া, গোবরডাঙা তো বটেই, এমনকি গোটা রাজ্য জুড়েই দেওয়ালে দেওয়ালে এই পোস্টার সাঁটিয়ে প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিটি। শুধু বিচারের দাবিই নয়, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বরুণের আদর্শ বাঁচিয়ে রাখতে সারা বছর ধরেই নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড ও ‘বরুণ চর্চা’ চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।
আজকের এই আবেগঘন স্মরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বরুণ বিশ্বাসের দীর্ঘদিনের সহকর্মী তথা বিশিষ্ট নাট্যকর্মী ও কমিটির অন্যতম সহ-সভাপতি বিপ্লব নাহা বিশ্বাস। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ বিজ্ঞান বেরা, প্রবীণ বাচিক শিল্পী রনেন্দ্রনাথ ধারা, মিত্র ইনস্টিটিউশনের বর্তমান প্রধান শিক্ষক সায়ন্তন দাস, শিল্পী সাংস্কৃতিক কর্মী বুদ্ধিজীবী মঞ্চের সম্পাদক দিলীপ চক্রবর্তী, প্রখ্যাত সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ী ও বিশিষ্ট তথ্যচিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার। খেলার মাঠকেও যে বরুণবাবু প্রতিবাদের অঙ্গ করে নিয়েছিলেন, সেই স্মৃতিকে সম্মান জানাতে হাজির ছিলেন প্রাক্তন ভারতীয় ফুটবলার তথা সেন্ট্রাল ক্যালকাটা গোষ্ঠ পাল মেমোরিয়াল স্পোর্টিং ক্লাবের প্রধান কোচ জুলফিকার আলি দাদা। পাশাপাশি স্কুলের শিক্ষক, অভিভাবক, কমিটির সদস্যরা এবং ক্লাবের খুদে ফুটবলাররাও শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন। প্রসঙ্গত, এই স্মরণ অনুষ্ঠানের অঙ্গ হিসেবে গতকালই একটি প্রীতি ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়েছিল, আজ বিজয়ী খেলোয়াড়দের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
মূল অনুষ্ঠানটি কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনে হলেও আজ সুটিয়া সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নানা সংগঠন ও সাধারণ মানুষ বরুণ বিশ্বাসকে স্মরণ করেছেন। শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের পাশাপাশি প্রতিটি মঞ্চ থেকেই সমাজ ও নারীর মর্যাদা রক্ষা এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার নতুন শপথ নেওয়া হয়েছে।
কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আজ থেকে আগামী ১১ই জুলাই পর্যন্ত গোটা রাজ্য জুড়ে ‘বরুণ বিশ্বাস স্মরণ সপ্তাহ’ পালন করা হবে। এই স্মরণ সপ্তাহের শেষ দিনে, অর্থাৎ ১১ই জুলাই ঠিক সন্ধ্যা ৭টায় ‘আন্দোলনের সংবাদ’ ও ‘বরুণ বিশ্বাস স্মৃতিরক্ষা কমিটি’র ফেসবুক পেজ এবং ইউটিউব চ্যানেল থেকে একটি বিশেষ লাইভ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। ‘বরুণ বিশ্বাস - নারীর মর্যাদা ও মানবাধিকারের সঙ্কট’ শীর্ষক এই ডিজিটাল আলোচনায় বক্তা হিসেবে যোগ দেবেন শতরূপা সান্যাল, ডাঃ তরুণ মন্ডল, ননিগোপাল পোদ্দার ও বিশ্বজিৎ মিত্র। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করবেন চঞ্চল ঘোষ। বরুণের লড়াই ফুরিয়ে যায়নি, বরং নতুন করে সাধারণ মানুষের মধ্যে সেই প্রতিবাদের ভাষা ছড়িয়ে দেওয়াই এই স্মরণ সপ্তাহের মূল লক্ষ্য।