মশা নয়, এবার কিন্তু আবহাওয়া দেখেই মাপা যাবে ডেঙ্গির ঝুঁকি! আইআইটি খড়গপুরের বিশেষ মডেল
News18 বাংলা | ০৩ জুলাই ২০২৬
রাজ্যে প্রবেশ করেছে বর্ষা৷ বৃষ্টির সময় ডেঙ্গির প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ডেঙ্গির মোকাবিলায় এবার এক অভিনব ও আধুনিক প্রযুক্তি আবিষ্কার আইআইটি খড়গপুরের। আবহাওয়া, জমির প্রকৃতি এবং জনসংখ্যার মতো একাধিক তথ্যের নিবিড় বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে ডেঙ্গির আগাম ঝুঁকি মাপার এক বিশেষ মডেল তৈরি করেছেন সেখানকার গবেষকরা।
আইআইটি খড়গপুর-এর ‘সেন্টার ফর ওশেন, রিভার, অ্যাটমোস্ফিয়ার অ্যান্ড ল্যান্ড সায়েন্সেস’ (কোরাল)-এর অধ্যাপক এ.এন.ভি. সত্যনারায়ণ এবং তাঁর পিএইচডি গবেষক পেরি সুব্রহ্মণ্য হরি প্রসাদের তৈরি এই মডেলটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ক্লাইমেড’ (CliMed)। এটি মূলত জলবায়ু এবং পরিবেশের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে গোটা ভারতে ডেঙ্গু বিস্তারের একটি আগাম সতর্কবার্তা দিতে সক্ষম।
ডেঙ্গির প্রাদুর্ভাব কেবল মশার কামড় বা হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না, এর নেপথ্যে কাজ করে অনেকগুলো পারিপার্শ্বিক কারণ। ক্লাইমেড ঠিক এই জটিল জায়গাটিতেই কাজ করে। এই মডেলটি প্রতিদিনের তাপমাত্রার ওঠানামা, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা, জমির ব্যবহার, জনবসতির ধরন এবং মশার বংশবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশের মতো নানা দিক একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে।
যেমন, তাপমাত্রা মশার আয়ু, কামড়ানোর প্রবণতা এবং মশার শরীরে ডেঙ্গি ভাইরাসের সক্রিয় হওয়ার সময়কালকে নিয়ন্ত্রণ করে। আবার মাঝারি বৃষ্টিপাত মশার বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করলেও, অতিভারী বৃষ্টিতে মশার অপরিণত লার্ভা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণও মশার বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি জনঘনত্ব এবং বসতির ধরন ঠিক করে দেয় যে, ঠিক কত বিপুল সংখ্যক মানুষ এই সংক্রমণের শিকার হতে পারেন। এই মডেলটি ডেঙ্গি ছড়ানোর জন্য দায়ী দুই প্রধান প্রজাতির মশা নিয়ে কাজ করে— শহরাঞ্চলের পরিচিত ভেক্টর ‘এডিস ইজিপ্টাই’ এবং তুলনামূলক ঠান্ডা ও গাছপালা ঘেরা আধা-শহরাঞ্চলের ‘এডিস অ্যালবোপিকটাস’। ফলে ঋতু এবং অঞ্চলভেদে কোন মশার উপদ্রব বাড়তে পারে, ক্লাইমেড তা সহজেই চিহ্নিত করতে পারে।
এই গবেষণার উদ্দেশ্য এবং অভিনবত্ব প্রসঙ্গে অধ্যাপক এ.এন.ভি. সত্যনারায়ণ বলেন, “ডেঙ্গির ঝুঁকিকে আমরা শুধুমাত্র আবহাওয়া এবং আক্রান্তের সংখ্যার একটি সাধারণ পরিসংখ্যান হিসেবে দেখতে চাইনি। আমাদের এই ক্লাইমেড মডেলটি মূলত স্বাস্থ্য সংক্রান্ত আগাম প্রস্তুতির কাজে একটি পরিবেশগত এবং জৈবিক স্তর যোগ করবে। সাধারণত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসা রোগীর সংখ্যা থেকে ডেঙ্গির প্রাদুর্ভাব মাপা হয়, যার হিসেবে অনেক সময়ই দেরি হতে পারে বা ফাঁক থেকে যেতে পারে। কিন্তু আমাদের এই মডেলটি একটি পরিপূরক চিত্র তুলে ধরবে। এটি আগেভাগেই জানিয়ে দেবে যে, ঠিক কোন দিনে এবং কোন নির্দিষ্ট এলাকায় স্থানীয় আবহাওয়া ও পরিবেশ মশার বংশবৃদ্ধি এবং সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য সবচেয়ে বেশি অনুকূল হয়ে উঠছে।” তবে এই প্রযুক্তিকে সাধুবাদ জানিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক সৌম্যশঙ্কর সারেঙ্গি বলেন, যদি সংশ্লিষ্ট অধ্যাপক রাজ্য সরকারের সঙ্গে এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে তবে আরও ভাল ভাবে ডেঙ্গি মোকাবিলা সম্ভব। তবে নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে যোগাযোগ করতে হবে।
ক্লাইমেড মূলত ডেঙ্গু ঝুঁকির একাধিক মাত্রাকে সামনে রেখে দু’ধরনের সূচক তৈরি করে। প্রথমটি হল, জনঘনত্বের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি হিসেব, যা বলে দেয় কোথায় সবচেয়ে বেশি মানুষ নতুন করে আক্রান্ত হতে পারেন। দ্বিতীয়টি হল, পরিবেশগত বা ‘ট্রান্সমিশন-প্রেশার’ সূচক, যা আবহাওয়ার কারণে মশার কামড় বা ভাইরাসের বিস্তারের সম্ভাবনা কতটা বাড়ছে তা নির্দেশ করে। এই দুই সূচকের সাহায্যে স্বাস্থ্য আধিকারিকরা বুঝতে পারবেন যে, কোন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মাঝারি মাপের পরিবেশগত অনুকূলতাও মারাত্মক আকার নিতে পারে। আবার এমনও হতে পারে, কোনও এলাকায় আপাতত রোগীর সংখ্যা স্থিতিশীল থাকলেও পরিবেশগত কারণে মশার উপদ্রব বাড়ছে এবং সেখানে দ্রুত নজরদারি বা মশা নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতি প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় তথ্য পেলে দেশ, রাজ্য, জেলা বা কোনও নির্দিষ্ট ক্যাম্পাসের ক্ষেত্রেও এই মডেলটি অনায়াসে প্রয়োগ করা সম্ভব।
এটি মূলত একটি গবেষণামূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী মডেল, যা চিকিৎসকদের তথ্য ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে তবেই ব্যবহার করা উচিত। আগামী দিনে এই একই মডেলের কাঠামো সামান্য রদবদল করে জিকা বা চিকুনগুনিয়ার মত অন্যান্য মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব মাপারও পরিকল্পনা রয়েছে বিজ্ঞানীদের। আবহাওয়া বিজ্ঞানী, জনস্বাস্থ্য আধিকারিক এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইকে আরও মজবুত করাই এই ক্লাইমেড-এর মূল লক্ষ্য।