১০৯ মিনিটের থ্রিলারে ত্রাতা রামোস, VAR নাটকে কাঁদল ক্রোয়েশিয়া, শেষ ষোলোয় পর্তুগাল
এই সময় | ০৩ জুলাই ২০২৬
প্রবাদ আছে, ‘রাখে হরি মারে কে’। টরন্টোর এই রাত যেন সেই প্রবাদকেই নতুন করে সত্যি প্রমাণ করল। এক সময় মনে হচ্ছিল, ক্রিস্তিয়ানো রোনাল্দোদের (Cristiano Ronaldo) বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) স্বপ্ন বুঝি শেষ হয়ে গেল। ক্রোয়েশিয়ার (Croatia) গোল, পর্তুগালের ব্যর্থতা, বাতিল হওয়া সুযোগ— সব কিছুই যেন বিদায়ের গল্প লিখছিল। কিন্তু ফুটবল যে শেষ বাঁশি বাজার আগে পর্যন্ত কাউকে হার মানতে শেখায় না, সেটাই আবার দেখল বিশ্ব। ১০৯ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস নাটক, গোল, পাল্টা গোল, VAR-এর নির্মম রায় আর শেষ মুহূর্তের আবেগঘন মোড় পেরিয়ে গনসালো রামোসের জয়সূচক গোলে ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ১৬-তে জায়গা করে নিল পর্তুগাল।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণের ঝড় তোলে পর্তুগাল। ম্যাচের আট মিনিটের মাথায় রাফায়েল লেয়াও (Rafael Leao) একটি দারুণ সুযোগ তৈরি করে। তাঁর পাস পেয়ে ব্রুনো ফার্নান্ডেজ় (Bruno Fernandes) দু’টি শট নিলেও একবার গোলরক্ষক ডমিনিক লিভাকোভিচ (Dominik Livakovic) এবং আর একবার ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণ বাঁচিয়ে দেয় দলকে।
প্রথমার্ধে পেদ্রো নেতো (Pedro Neto) ছিলেন পর্তুগালের সবচেয়ে বড় আক্রমণভাগের অস্ত্র। একের পর এক বিপজ্জনক ক্রস তুলছিলেন তিনি, কিন্তু রোনাল্দো কিংবা অন্য কেউ সেগুলোকে গোলে পরিণত করতে পারেননি। অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়া খুব বেশি সুযোগ না পেলেও নিজেদের পরিকল্পনা মেনে ধৈর্য ধরে খেলছিল। মাঝমাঠে লুকা মদ্রিচ (Luka Modric), মাতেও কোভাচিচরা (Mateo Kovacic) ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করছিলেন।
বিরতির পরই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। কোচ জ্লাতকো দালিচ (Zlatko Dalic) দলে পরিবর্তন আনেন, আর তার ফলও দ্রুত পাওয়া যায়। ৫৩তম মিনিটে জোসিপ স্তানিশিচের (Josip Stanisic) ক্রস থেকে ইভান পেরিশিচ (Ivan Perisic) গোল করে ক্রোয়েশিয়াকে এগিয়ে দেন।
সেই মুহূর্তে পর্তুগালকে অনেকটাই দিশেহারা দেখাচ্ছিল। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল, আর গ্যালারিতে ভাসছিল একটা প্রশ্ন— এটাই কি তবে ক্রিস্তিয়ানো রোনাল্দোর আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের শেষ ম্যাচ?
গোলের পর আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে ক্রোয়েশিয়া। ইগর মাতানোভিচের (Igor Matanovic) একটি গোল অফসাইডে বাতিল হয়। পেতার সুচিচের (Petar Sucic) জোরালো শট দারুণভাবে বাঁচান দিয়োগো কোস্তা (Diogo Costa)। অন্যদিকে লেয়াওয়ের দূরপাল্লার শট ক্রসবারে লাগে, আর রোনাল্দোর একটি গোলও অফসাইডের কারণে বাতিল হয়ে যায়।
রোনাল্দোর পেনাল্টিতে বাঁচল পর্তুগাল
ঠিক যখন পর্তুগালের সামনে বিদায়ের আশঙ্কা ঘনিয়ে আসছিল, তখনই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। ৬৮তম মিনিটে কর্নার থেকে আসা বলে লেয়াওকে ধরে রেখেছিলেন নিকোলা ভ্লাসিচ (Nikola Vlasic), যে কারণে VAR-এর সাহায্যে পেনাল্টি দেয় রেফারি এসপেন এসকাস (Espen Eskas)। পেনাল্টি স্পটে দাঁড়িয়ে কোনও ভুল করেননি রোনাল্দো। ঠান্ডা মাথায় লিভাকোভিচকে পরাস্ত করে বল জালে পাঠিয়ে সমতা ফেরান। মুহূর্তেই গর্জে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। নিজের বিখ্যাত ‘সিইউ’ উদযাপন করেন রোনাল্দো, আর গ্যালারি থেকে হাজারো কণ্ঠে তার প্রতিধ্বনি ফিরে আসে।
তবে গোল করার পরও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি পর্তুগালের হাতে ছিল না। বরং ক্রোয়েশিয়াই বারবার আক্রমণে উঠে তাদের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখছিল। কোভাচিচের ২টি দূরপাল্লার শট, মাতানোভিচের সুযোগ— সবই দারুণ ভাবে সামাল দেন দিয়োগো কোস্তা।
এর মধ্যেই ৮২তম মিনিটে বড় সিদ্ধান্ত নেন পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ় (Roberto Martinez)। তিনি রোনাল্দোকে তুলে নিয়ে মাঠে নামান একেবারে তরুণ রুবেন নেভেসকে (Ruben Neves)। মাঠে তখনও ম্যাচের ভাগ্য অনিশ্চিত, তাই এই সিদ্ধান্ত অনেককেই অবাক করেছিল।
রামোসের গোল, VAR-এ শেষ ক্রোয়েশিয়ার স্বপ্ন
শেষ পর্যন্ত মার্তিনেজ়ের সেই সাহসী সিদ্ধান্তই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। রোনাল্দো মাঠ ছাড়ার পর মাঝমাঠে আরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে পর্তুগাল। আক্রমণের প্রায় সব বলই যেতে থাকে লেয়াওয়ের দিকে, যেন তিনিই কিছু একটা করে দেখাবেন। অবশেষে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের ইনজুরি টাইমের ৯৪তম মিনিটে সেটাই ঘটে। বাঁ দিক থেকে লেয়াওয়ের দুর্দান্ত ক্রসে উঁচুতে উঠে হেড করেন গনসালো রামোস। বল জালে জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে পর্তুগাল শিবির। রামোস যেন সুপার সাব হয়ে এসে দলকে নতুন জীবন দিলেন।
কিন্তু নাটক তখনও শেষ হয়নি। যোগ করা ১০ মিনিট সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে আবারও বল জালে জড়ায় ক্রোয়েশিয়া। বেঞ্চ থেকে খেলোয়াড়রা মাঠে ছুটে আসে, সমর্থকেরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। মনে হচ্ছিল, ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়াতে যাচ্ছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই শুরু হয় অপেক্ষা। VAR গোলটি পরীক্ষা করতে থাকে। পুরো স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ হয়ে যায়। প্রায় ১০ মিনিটের দীর্ঘ পর্যালোচনার পর রেফারি জানান, আক্রমণ গড়ার সময় অফসাইড হয়েছিল। ফলে জসকো গভার্দিওল (Josko Gvardiol) গোল বাতিল করা হয়।
এক মুহূর্তে আনন্দ বদলে যায় কান্নায়। ক্রোয়েশিয়ার খেলোয়াড়রা হতাশায় ভেঙে পড়েন, আর পর্তুগাল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে উদযাপনে মেতে ওঠে। বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন নাটকীয় প্রত্যাবর্তন খুব কমই দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত ঝড় সামলে পর্তুগাল জায়গা করে নিল শেষ ১৬-তে। আর ক্রোয়েশিয়ার জন্য এটি হয়ে রইল হৃদয়ভাঙা এক বিদায়, যা হয়তো তাদের সমর্থকেরা বহু বছর ভুলতে পারবেন না।