• মাতৃভাষা ও আত্মপরিচয় বাঁচিয়ে রাখার লড়াই ! জীবন্ত দলিল হতে চলেছে 'ডাউকি'
    eTV Bharat | ০২ জুলাই ২০২৬
  • কলকাতা, 2 জুলাই: অঙ্কিত বাগচীর প্রযোজনা এবং শৌভিক পণ্ডিতের পরিচালনায় আসছে রাজবংশী ভাষার স্বল্পদৈর্ঘের সিনেমা 'ডাউকি'। এটি নিছকই একটি ছবি নয়, বরং উত্তরবঙ্গের এক প্রাচীন জনগোষ্ঠীর লোককথা, লোকগান, উৎসব, ঐতিহ্য এবং আঞ্চলিক ভাষার রাজনীতির এক জীবন্ত দলিল। যুগ যুগ ধরে অবহেলিত একটি জনজাতির শিল্প-সংস্কৃতির কথা অত্যন্ত সাবলীলভাবে বলে এই ছবি।

    প্রবাদ আছে, জাত্যাভিমান হারালে জাতির অবক্ষয় অনিবার্য। আজকের এই গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নের যুগে যেখানে সারা বিশ্ব একটি বিশাল বাজারে পরিণত হয়েছে এবং শক্তিশালী সংস্কৃতির দাপটে প্রান্তিক সংস্কৃতি ও ভাষাগুলো ক্রমশ হারিয়ে যাওয়ার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানেই রাজবংশী ভাষা ও সংস্কৃতির গৌরবান্বিত শিকড় খোঁজার এক সাহসী উড়ান হল 'ডাউকি'।

    ছবির কেন্দ্রে রয়েছেন রাজবংশী ভাষার এক কবি, যে নিজের মাতৃভাষায় কবিতা প্রকাশের জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করে চলেছে। তার এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে ফুটে ওঠে, কীভাবে অন্যান্য শক্তিশালী ভাষার আগ্রাসনে একটি সমৃদ্ধ ভাষা কেবল 'উপভাষা'র তকমা পেয়ে প্রান্তিক হয়ে যায়। নিজের শিকড় ভোলা অনুচিত; এই দায়বদ্ধতা থেকেই সেই বাবা তার মেয়েকে রাজবংশী পুরাণের গল্প শোনায়। হারিয়ে যেতে বসা 'তিস্তা বুড়ির পুজো' কিংবা 'মেচেনি খেলা'র মতো নিজস্ব প্রাচীন ধর্মীয় প্রথা ও উৎসবগুলোর সঙ্গে পরিচয় করায়। তার প্রতিটি কথায় ধ্বনিত হয় মাতৃভাষার গুরুত্ব এবং ভাষা-আন্দোলনের এক সুদীর্ঘ ইতিহাস।

    ডিকোলোনাইজেশন বা বিউপনিবেশায়নের আদর্শ অর্থাৎ অন্যের চাপিয়ে দেওয়া আধিপত্য বা সংস্কৃতির দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে নিজস্ব আত্মপরিচয় ও স্বকীয়তা ফিরে পাওয়ার লড়াই, সেই চেতনাকেই ধারণ করেছে এই ছবি। এক সাধারণ রাজবংশী পরিবারের বাবা, মা ও মেয়ের প্রাত্যহিক যাপনের মধ্য দিয়ে এখানে হাজারো মানুষের না-বলা আখ্যান উঠে এসেছে।

    উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ি অঞ্চলে শুটিং হয়েছে ছবিটির। বিখ্যাত গবেষক দীনেশ চন্দ্র রায় ও স্বনামধন্য সঙ্গীত শিল্পী দীপ্তি রায় সহ তুক্ষা অ্যাকাডেমির সকল রাজবংশী সম্প্রদায়ের শিল্পীদের সার্বিক সহযোগিতায় ও আন্তরিকতায় এই রাজবংশী স্বল্প দৈর্ঘের ছবি, 'ডাউকি' বানানো সম্ভব হয়েছে। কার্যনির্বাহী প্রযোজক তথা ময়নাগুড়ির প্রখ্যাত লোকশিল্পী অনিন্দিতা রায় ও তার গানের দলের অসামান্য অবদান এই ছবির অন্যতম সম্পদ।

    সুপ্রাচীন এই জনজাতির নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি ও লোককথা থাকা সত্ত্বেও কেন এতদিন রাজবংশী ভাষায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ ছবি তৈরি হয়নি? কেন তাদের কথা এতদিন অব্যক্তই রয়ে গেল? 'ডাউকি' সেই দীর্ঘকালীন বঞ্চনার প্রশ্নটিই তীব্রভাবে তুলে ধরেছে এবং নিজেই তার যোগ্য উত্তর হয়ে উঠেছে। অভিনয় করেছেন পরিমল রায়, রিনা রায়, শ্রেয়সী রায়, বাপি রায় প্রমুখ রাজবংশী শিল্পী। চিত্রগ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন কল্পতরু জানা। এছাড়াও সুবীর রায়, রাজেশ রায়, সংঘমিত্রা রায়, প্রসেনজিৎ বর্মণের মতো বহু রাজবংশী শিল্পীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছবিটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

    রাজবংশী শব্দ 'ডাউকি'-র বাংলা অর্থ হলো 'ডাহুক পাখি'। লুপ্তপ্রায় ডাহুক পাখির বেঁচে থাকার লড়াইয়ের মতোই, এই ছবি এক আদি জনজাতির হারিয়ে যাওয়া শিকড় ফিরে পাওয়ার নিরন্তর সংগ্রামকে তুলে ধরে। একজনের কাহিনির ভেতর দিয়ে গোটা একটি গোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার এই অদম্য তাগিদ, আমাদের আরও একবার মাতৃভাষা উদযাপনের প্রকৃত কারণটি মনে করিয়ে দেয়। খুব শিগগিরই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নিজেদের যাত্রা শুরু করতে চলেছে 'ডাউকি'।
  • Link to this news (eTV Bharat)