• বর্ষার খামখেয়ালি আচরণ, কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে খাদ্য সুরক্ষা
    eTV Bharat | ০২ জুলাই ২০২৬
  • আবহাওয়ার খামখেয়ালি আচরণ দেশের কৃষকদের কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলেছে। অনিয়মিত বৃষ্টি আন্তর্জাতিক শক্তি ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। সারের বাজারেও লেগেছে আগুন। এর সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তৈরি হওয়া অস্থিরতার প্রতিকূল প্রভাব পড়েছে বিশ্ব বাণিজ্যে। সবমিলিয়ে নীতি নির্ধারকরা একপ্রকার বাধ্য হচ্ছেন বর্ষাকালে কৃষি ক্ষেত্রে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে। সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রক এবং কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরের দেওয়া তথ্য় বলছে, দেশের বেশিরভাগ অংশেই জুন মাসে পর্যাপ্ত পরিমাণে বৃষ্টি হয়নি। কোনও কোনও অঞ্চলে বৃষ্টি ঘাটতির পরিমাণ 40 শতাংশ। কোথাও তা 60 শতাংশ। যে মরশুমে টানা বৃষ্টি হওয়ার কথা সেখানে দেশের কোনও কোনও অংশ বিক্ষিপ্তভাবে গরমের দাপট দেখেছে।

    হাওয়া অফিস মনে করছে, ভারতে বর্ষার এই অনিয়মিত হওয়ার প্রধান কারণ এলনিনো। এলনিনোর ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। তার প্রভাব পড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের তাপমাত্রার উপর। এই এলনিনোর প্রভাবেই দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ছে। বর্ষা পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রতিবছর যে এক ধরনের প্রভাব পড়ে তা নয়। এ বছর গ্রীষ্মকালের মাত্রাতিরিক্ত তাপপ্রবাহ এবং অসময়ে পশ্চিমি ঝঞ্ঝা থেকে শুরু করে আবহাওয়ার সামগ্রিক বদলকেও এলনিনোর প্রভাব বলেই ব্যাখ্যা করেছে মৌসম ভবন। উল্লেখ্য়, গত কয়েক মাসে উত্তর ভারতের একাধিক রাজ্যে অসময়ে বৃষ্টি ও ঝড় হয়েছে। সেটাও আবহাওয়ার সাধারণ গতিপ্রকৃতিকে নষ্ট করেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে ঝড় থেকে শুরু করে অতিবৃষ্টির মতো ঘটনা আগের থেকে বেশি ঘটছে। আর সেই কারণে বর্ষাকালে কী পরিমাণে বৃষ্টি হবে সেটা আগে থেকে অনুমান করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

    কৃষিক্ষেত্রের সমস্যা

    ভারতের কৃষিকাজ প্রায় সম্পূর্ণ নির্ভর করে দক্ষিণ পশ্চিমী মৌসুমী বায়ুর উপর। গত কয়েক দশকের মধ্যে ভারতে সেচ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু তারপরও দেশের আবাদি জমির বেশিটাই এখনও কৃষিকাজ থেকে শুরু করে সেচ এবং ভূগর্ভস্থ জলের ভাণ্ডারের জন্য় বর্ষার উপর নির্ভর করে।

    এবার অনিয়মিত এবং দেরি করে আসা বর্ষা খারিফ মরশুমকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে ধানের উৎপাদন। উত্তর এবং উত্তরপূর্ব ভারতে সর্বাধিক ধানের চাষ এই জুন মাসেই হয়ে থাকে। কিন্তু গরমের দাপট এবং লুয়ের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ধানের চারার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

    আবহাওয়ার খামখেয়ালি আচরণ সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে উত্তরপ্রদেশে। সেথানকার বিভিন্ন জেলায় কখনও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বেশি থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে হাওয়া অফিস। আবার কখনও তারা বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। সবচেয়ে দরকারি কথা এই তারতম্য হয়েছে খুব কম সময়ের মধ্যে। কৃষিজাত উৎপাদনের উপর তার বিপরীত প্রভাব পড়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আবহাওয়া সংক্রান্ত পূর্বাভাস নির্দিষ্ট সময়ে দেওয়া গেলে এবং কৃষকদের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করলে তাঁরা চাষাবাদ নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

    গরমের প্রভাব পড়ছে কৃষি কাজে

    আবাহাওয়ার পাশাপাশি মাটির আদ্রর্তা কমে যাওয়াও বীজ বপনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে। আধুনিক শস্যের বীজ আবহাওয়া স্থিতিস্থাপক থাকলে সবচেয়ে ভালো ফল দিতে পারে। কিন্তু আবহাওয়া প্রতিকূল হলে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন পড়ে। দরকার হয়ে পড়ে বেশি পরিমাণ সারের। আবহাওয়ার তারতম্য পোকামাকড়ের সংখ্যাও বাড়িয়ে দেয়। তাদের থেকে হওয়া রোগের সংখ্যাও বাড়ে অনেকটাই। এর ফলে চাষাবাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তাও আবার চাষ শুরু হওয়ার একেবারে প্রাথমিক স্তরে।

    জলের জোগান আরেকটি বড় সমস্যা। সেচের কাজ হয়ে গিয়েছে এমন জায়গার পরিস্থিতি যেখানে যেখানে বৃষ্টি হয়নি তার থেকে ভালো। কিন্তু ইতিমধ্যেই দেশের বেশ কিছু অংশে আগে থেকে জমিয়ে রাখা জলের পরিমাণে টান পড়তে শুরু করেছে। বর্ষার শুরুর দিকে বৃষ্টি কম হওয়ার ফল মরশুমের শেষ দিকে পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

    দীর্ঘ একটা সময় ধরে পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে জমানো জলের পরিমাণ কমতে শুরু করেছে। এতদিন গড়ে যে পরিমাণ জল সংগ্রহ করে রাখা ছিল সেটা এখন কমে গিয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বৃষ্টি ঘাটতি পূরণ না হলে দেশের বিভিন্ন অংশে শুধু কৃষিকাজের জন্য় জল মিলবে না তা নয়, দেখা দেবে পানীয় জলের সঙ্কটও। সম্পূর্ণ বৃষ্টির জলের উপর নির্ভর করে কৃষিকাজ করেন এমন কৃষকদের পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। বৃষ্টিতে দেরি হলে হয় তাঁদের উৎপাদিত ফসলের পরিমাণ কম হবে নয়তো পড়তে হবে বিরাট আর্থিক ক্ষতির মুখে।

    দীর্ঘমেযাদি বিপদ

    আবহাওয়া দফতর বলছে এলনিনোর প্রভাব আরও গভীর হবে আগামী কয়েক মাসে। দেশের বিভিন্ন অংশে অনিয়মিত বৃষ্টি হবে। কোথাও আবার বাড়বে তাপমাত্রা। খরিফ মরশুম তো বটেই রবি মরশুমও এই প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারবে না। এমনটা হলে শুধু কৃষিজাত উৎপাদনই কম হবে তা নয়। চাপ বাড়বে সেচের কাজের উপর। গ্রামীণ অর্থনীতি প্রভাবিত হবে। দাম বাড়বে খাবারের।

    একইসঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে বিশ্ববাজারে সারের পর্যাপ্ত জোগান মিলবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা গিয়েছে। তবে গত কয়ের বছরের মধ্যে ভারত পর্যাপ্ত পরিমাণে শস্য মজুদ করেছে। সারের জোগানের অভাব হবে না এমন ব্যবস্থাও করেছে দিল্লি। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে সারের আমদানি খরচ বাড়বে। সেটা যে কৃষিক্ষেত্রকে আরও এক নতুন অর্থনৈতিক চাপের মুখে ফেলবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কৃষির সঙ্গে সম্পূক্ত অর্থনীতি নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন তাঁরা মনে করছেন, কৃষিতে উৎপাদন কমলে গ্রামের মানুষের রোজগার কমবে। তার ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও ধাক্কা খাবে। খাদ্যে মুদ্রাস্ফিতি বাড়বে।

    এলনিনোর প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে যে সমস্ত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার তা গ্রহণের ব্যাপারে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। কৃষকদের বলা হয়েছে এমন ফসল ফলাতে যা খরা-জনিত পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারে। উৎসাহিত করা হয়েছে মিলেট চাষে। আগে থেকে মজুত করে রাখা খাদ্যপণ্যের ব্যাপারেও যত্নবান কেন্দ্রীয় সরকার। এখান থেকে দেশের প্রয়োজন যাতে পুরোপুরি মেটে তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্ষার সময়ে সামগ্রিকভাবে কতটা উৎপাদন হচ্ছে তার দিকেও ক্রমাগত নজর রাখা হচ্ছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে এই বন্দোবস্ত চালু রাখতে গেলে সমগ্র ব্য়বস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে। শুধুমাত্র জরুরি ভিত্তিতে পরিস্থিতি সামাল দিলেই হবে না।

    কৃষিবিদরা বলছেন, ভারতের আবহাওয়া সংক্রান্ত পূর্বাভাস দেওয়ার ব্য়বস্থাকে আরও শক্তিশালী করা উচিত। দেশের সবচেয়ে দূরবর্তী প্রান্তে থাকা কৃষকের কাছেও আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনেক আগে থেকেই পৌঁছে দেওয়া দরকার। যাতে কৃষিকাজের ক্ষেত্রে কোনও বড় সিদ্ধান্ত নিতে তাঁদের সমস্যায় পড়তে না হয়। পাশাপাশি মিলেট থেকে শুরু করে ডাল ও তৈলবীজের উৎপাদন বাড়ানোর ব্যাপারেও জোর দিয়েছেন তাঁরা। এর ফলে জলের ব্যবহার হবে পরিমিত। কমিউনিটি বীজ ব্যাঙ্কে বিনিয়োগ করা, সেচের পর্যাপ্ত পরিকাঠামো তৈরি এবং স্থানীয় স্তরে জল সংরক্ষণ প্রকল্প নির্মাণের পাশাপাশি জলাধার অববাহিকা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শক্তি দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

    এর পাশাপাশি অনেক গবেষক সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থার প্রসার, জৈব পদার্থের মাধ্যমে মাটির গুণমানের উন্নয়ন এবং যেখানে সম্ভব সেখানে আমদানি করা রাসায়নিক উপকরণ ব্যবহারের উপর অত্যধিক নির্ভরতা কমানের পক্ষে। সরকারি পুষ্টি কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী ফসলের সংগ্রহ বৃদ্ধি করা হলে তা একই সঙ্গে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি করবে এবং খাদ্য ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনবে। শুধু তাই নয়, স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করতেও সহায়ক ভূমিকা নিতে পারে।

    পরীক্ষার মুখে খাদ্য সুরক্ষা

    ভারতীয় কৃষিক্ষেত্র এক চরম অনিশ্চয়তার বৃত্তে প্রবেশ করছে। সেখানে আবহাওয়ার খামখেয়ালি আচরণের সঙ্গে যোগ হয়েছে বিশ্বস্তরে তৈরি হওয়া আর্থিক চাপ। আপাতত পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে সেটা নির্ভর করবে আগামী কয়েক সপ্তাহে কতটা বৃষ্টি হয় তার উপর। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে সমস্যার হাত থেকে রেহাই যদি মিলেও যায় তাহলেই সবটা মিটে গেলে এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সেটার জন্য প্রয়োজন হবে বড় বিনিয়োগের। জল কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটাও হয়ে উঠবে গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিতে আনতে হবে বৈচিত্র্য। কৃষি ব্যবস্থাকে করে তুলতে হবে আধুনিক। সবমিলিয়ে বলাই যায় আগামী বছর ভারতকে পড়তে হবে কডা চ্যালেঞ্জের মুখে। সেখানে আবহাওয়ার খামখেয়ালি আচরণের পাশাপাশি সইতে হচ্ছে আন্তর্জাতিক সংঘাতের আবহ। এই দুই সমস্যার মাঝে পড়ে দেশের খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো ভারতের পক্ষে যে খুব একটা সহজ হবে না সেটা বোঝাই যাচ্ছে।
  • Link to this news (eTV Bharat)