• প্যারাকোয়াটের মৃত্যু থাবা থেকে কি বেঁচে ফেরা সম্ভব?
    আজকাল | ০৩ জুলাই ২০২৬
  • গোপাল সাহা 

    মানব জীবনের আশীর্বাদই এবার নেমে এল অভিশাপ রূপে! প্যারাকোয়াট কীটনাশক মানবজীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চাষের জমির আগাছা থেকে শুরু করে রাস্তাঘাটে যে কোনও ধরনের আগাছা, ঘাস নির্মূল করতে এই কীটনাশকের ব্যবহার বহুল প্রচলিত। আর এই কীটনাশকের ভয়াবহ বিষক্রিয়ার কারণে জনজীবনে অভিশাপ হয়ে মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবহৃত হচ্ছে কখনও হত্যা বা আত্মহত্যার ক্ষেত্রে।

    প্যারাকোয়াট একটি অত্যন্ত বিষাক্ত বাণিজ্যিক আগাছানাশক। এই কীটনাশক মানুষের শরীরে গেলে মৃত্যু প্রায় অবধারিত এবং এর কোনও প্রতিষেধক নেই। এর বিষক্রিয়ায় মানুষের শরীরের কোষের ক্ষতি খুব দ্রুত হয়, যা প্রধানত হার্ট, ফুসফুস, কিডনি এবং লিভারকে ভয়ানকভাবে প্রভাবিত করে। মূলত এই বিষ মানুষ খেলে পাকস্থলীর মধ্য দিয়ে কিডনিতে প্রবেশ করে। আর এর বিষের প্রতিক্রিয়ার পরিমাণ এতটাই ভয়ঙ্কর যে প্রথমেই কিডনিকে আক্রান্ত করে। এই কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় ৬ থেকে ৭ দিনের মধ্যে সেই রোগীর মৃত্যুর হার ৯৫ শতাংশ। পাঁচ শতাংশ মাত্র বাঁচার সম্ভাবনা থাকে যদি ঠিক মতো তার সঠিক সময় চিকিৎসা হয়। এর চিকিৎসা সময় কাল ৩০ মিনিটের মধ্যে বলেই দাবি বিশেষজ্ঞদের।

    নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেক দেশ এর ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। অনেক দেশ এই কীটনাশকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে লাইসেন্সপ্রাপ্ত পেশাদারদের দ্বারা এর বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। কলকাতার ৫টি মর্গ এবং সরকারি হাসপাতালগুলির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছ’মাসের এই বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর হার অনেক বেড়েছে।  আরজি করে গত ছ’মাসে মৃত্যু ২৩০-২৪০ জনের এবং আক্রান্ত ৩০০-৩৫০ জন। কলকাতা মেডিকেল কলেজে মত্যু ৫৫-৬০ জন এবং ১৮০-২০০ জন আক্রান্ত, এনআরএস হাসপাতালে ৩৫-৪০ জন এর মৃত্যু, ৯০-১১০ জন আক্রান্ত, এসএসকেএম হাসপাতালে ৩০-৩৫ জনের মৃত্যু, ১৮০-২০০ জন আক্রান্ত এবং কাঁটাপুকুর মর্গ ৩৫-৪২ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে (এই পরিসংখ্যান ২০২৬ এর শেষ ৬ মাসের গৃহীত আনুমানিক তথ্য অনুযায়ী)।

    পরিসংখ্যান বলছে এই বিষক্রিয়ায় যত পরিমাণ আক্রান্ত হয়েছে তার ৯৫ শতাংশ মৃত্যু ঘটে। সুস্থতার পরিমাণ মাত্র পাঁচ শতাংশ। যদিও এই পাঁচ শতাংশ মানুষ জীবিত হন যদি সময়মতো সঠিক চিকিৎসা হয় তবেই। মূলত ৩০ মিনিটের মধ্যে চিকিৎসা হওয়া জরুরি। মোট আত্মহত্যার যে সংখ্যা রয়েছে তার মধ্যে এক তৃতীয়াংশ বিষক্রিয়ায় মৃত্যু, যার সিংহভাগটাই কীটনাশক বিষক্রিয়ার কারণে। মানসিক দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, প্রতি ৩ সেকেন্ডে এক জন মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করে। আর প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজনের মৃত্যু ঘটে।  

    এই বিষয়ে আজকাল ডট ইনের মুখোমুখি হয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী চিকিৎসক শারদ্বত মুখার্জি বলেন, “আমাদের গ্রাম বাংলায় এই কীটনাশকের যথেষ্ট পরিমাণ ব্যবহার হয়। পাশাপাশি এই কীটনাশক অবশ্যই মারণবিষ। আর এই বিষ মানুষের দেহে গেলে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব। এক্ষেত্রে মৃত্যুহার ৯০ থেকে ৯৫%। এই কীটনাশক বিক্রির সময় বোতলে অবশ্যই লেভেলিং করা উচিত সচেতনতার বার্তা দিয়ে। এর ক্ষেত্রে আরও প্রয়োজন জনজীবন থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখা। সমাজের যতটা সম্ভব সচেতনতা তৈরি করা। একই সঙ্গে প্রয়োজন মানুষকে অবগত করা, যাতে মানুষ খেয়ে না ফেলেন। প্রয়োজন ছাড়া যেন এর সান্নিধ্যে মানুষ না আসেন।”

    তিনি আরও বলেন, “সবচেয়ে বড় বিষয়, গ্রামের জীবিকা নির্বাহ প্যারাকোয়াটের উপর নির্ভরশীল। তাই এই কীটনাশককে সম্পূর্ণ ব্যান করা এই মুহূর্তে সম্ভব হবে না। যথেষ্ট পরিমাণ মানুষকে সচেতন হতে হবে ও সচেতন করতে হবে। তাতেও যদি কোন কাজ না হয় তারপরে ভাবা যাবে অবশ্যই। আমি শুনেছি এই কীটনাশক নিয়ে বহু পূর্বেই সংসদে আলোচনা হয়েছিল। আলোচনা হয়েছিল এর ভয়াবহতা নিয়ে। জাতীয় স্তরে এই কীটনাশক বা বিষ নিয়ে সচেতনতার বিষয়ে একাধিকবার কথা হয়। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় সাধারণ মানুষকে সবার আগে সচেতন হতে হবে।”

    তিনি এই বিষয়ে আরও বলেন, “যে সমস্ত মানুষদের মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতা রয়েছে তারা, যে কোন উপায়েই আত্মহত্যা করার চেষ্টা করতে পারে। এই জন্য জরুরী তাদের মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া।”

    মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, “আমাদের দেশে প্রত্যেক বছর এক লক্ষ ৭৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় আত্মহত্যাজনিত কারণে, ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী। আর সারা বিশ্বের পরিসংখ্যান হিসেবে ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বছরে ৮ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় আত্মহত্যার কারণে। আমাদের দেশে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয় ৩৩% মানুষের। যার মধ্যে সিংহভাগ কীটনাশকের কারণে। আর গলায় দড়ি দিয়ে মৃত্যু ৩২ শতাংশ। আর এই কীটনাশকের কারণে মৃত্যু প্রায় অবশ্যম্ভাবী কারণ এর বিষক্রিয়ায় প্যারাসাইট বিষের প্রভাব রয়েছে। মানুষ যখন বদ্ধপরিকর হয় সে আত্মহত্যা করবেই তখন সে এই ঘাস মারার কীটনাশক খায়। কারণ এটি সায়ানাইড বিষের প্রভাব রয়েছে, যার কারণে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।” 

    তিনি আরও বলেন, “এই কীটনাশক বিক্রির ক্ষেত্রে কিংবা বাণিজ্যিকের ক্ষেত্রে সরকার থেকে একটি নিয়মাবলী আনা উচিত, যা যে কেউ যত্রতত্র কিনতে পারবে না তাঁর পরিচয়পত্র ছাড়া। যে কেউ চাইলে এই কীটনাশক বিক্রি পর্যন্ত করতে পারবেন না। তার জন্য সরকারের কিছু বিশেষ বিধি নিষেধ ও নিয়মাবলী বেঁধে দেওয়া।”
  • Link to this news (আজকাল)