• ঐতিহ্যের সুতোয় GI ট্যাগ, ফ্যাশন ট্রেন্ডে ‘সুপারহিট’ বঙ্গের বেগমপুরী, আশায় কারিগররা
    এই সময় | ০৩ জুলাই ২০২৬
  • সুজয় মুখোপাধ্যায়, অয়ন্তিকা সাহা

    ফ্যাশনের দুনিয়ায় প্রায় রোজই বদলাচ্ছে ট্রেন্ড, কিন্তু বাংলার তাঁতের আভিজাত্যকে টেক্কা দেওয়ার সাধ্য কার? তাঁতের সেই আভিজাত্যের তালিকায় কামব্যাক করেছে হুগলির ঐতিহ্যবাহী ‘বেগমপুরী শাড়ি’। একসময় যা কেবল আটপৌরে বা বয়স্কদের শাড়ি বলেই ভাবা হতো, আজ তা উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব়্যাম্পে। বেগমপুরী এখন হয়ে উঠেছে আধুনিকতার প্রতীক। জ্যামিতিক নকশা আর খাদি-লিনেনের ফিউশনে তৈরি এই শাড়ি এখন কলেজ পড়ুয়া থেকে কর্পোরেট অফিসের তরুণী—বিভিন্ন বয়সি এবং সেই সঙ্গে বিবিধ শ্রেণির নারীর ক্যাজ়ুয়াল ও ফর্মাল লুকের ক্ষেত্রে ফার্স্ট প্রেফারেন্স।

    দীর্ঘ লড়াইয়ের পরে হুগলির বেগমপুরের বিখ্যাত এই হ্যান্ডলুম শাড়ি পেয়েছে জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন বা GI তকমা। বেগমপুর হ্যান্ডলুম ক্লাস্টার ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির পক্ষ থেকে এই স্বীকৃতির আবেদন জানানো হয়েছিল। সম্প্রতি বেগমপুরের হ্যান্ডলুম শাড়ির GI রেজিস্ট্রেশন নম্বর চলে আসার খবরে স্বভাবতই খুশি এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি তথা ব্যবসায়ীরা। তবে খুশির খবরের মধ্যেও রয়েছে চিন্তার মেঘ। বর্তমানে পাওয়ারলুমের রমরমা এবং আধুনিকতার কারণে শতাব্দী প্রাচীন তাঁত শিল্প একপ্রকার অস্তিত্ব সঙ্কটে। তবে সমসাময়িক ট্রেন্ডের কথা মাথায় রেখে তৈরি হচ্ছে বেগমপুরী হ্যান্ডলুমের কুর্তি, ড্রেস বা নানা রকম ফিউশন। রঙের ক্ষেত্রেও এসেছে বৈচিত্র। সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন বুটিকের হাত ধরে বাংলার এই বেগমপুরী এখন দেশ-বিদেশে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

    বেগমপুরী হ্যান্ডলুমের GI স্বীকৃতির লড়াই শুরু হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে। ২০১০ সালে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথ উদ্যোগে এই তাঁত ক্লাস্টার প্রজেক্ট শুরু হয়। অসংগঠিত তাঁতিদের স্বনির্ভর দলের মাধ্যমে একত্রিত করে এই বেগমপুর হ্যান্ডলুম ক্লাস্টার তৈরি হয়েছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই শিল্পের উন্নতির জন্য প্রতিটি হ্যান্ডলুম ক্লাস্টারকে ১০ লক্ষ টাকা করে দিয়েছিলেন।

    ২০২২ সালে এই শাড়ির GI স্বীকৃতির জন্য আবেদন করা হয়েছিল। তার চার বছর পরে এ বার, ২০২৬ সালে মিলল সেই স্বীকৃতি। ওয়েস্ট বেঙ্গল ন্যাশনাল জুডিশিয়াল সায়েন্স ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন আধিকারিক পিনাকী ঘোষ বলেন, ‘GI স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানত চার-পাঁচটি বিষয় খতিয়ে দেখা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ওই শিল্পের ইতিহাস, সেটি কত বছরের পুরোনো, কেন এবং কী ভাবে শুরু হয়েছিল। এ ছাড়াও, বর্তমানে ওই শিল্প কতটা বিলুপ্তির পথে এবং তার ভৌগোলিক অবস্থান কী, তা লক্ষ্য করা হয়। সঙ্গে কতজন কারিগর এই শিল্পের সঙ্গের এর সঙ্গে যুক্ত, খতিয়ে দেখা হয় তা-ও।’ পিনাকী ঘোষ আরও জানিয়েছেন, GI কোনও একজন ব্যক্তিকে দেওয়া হয় না। এটি পায় একটি অ্যাসোসিয়েশন। এর ফলে ওই অ্যাসোসিয়েশনের সমস্ত সদস্যই এই স্বীকৃতির মালিক হন।

    বেগমপুরের এই তাঁত ২০০-৩০০ বছরের পুরোনো। মূলত বেগমপুরের নাম থেকেই এসেছে এই শাড়ির নাম। বর্তমানে এখানের তাঁত ক্লাস্টারের সঙ্গে প্রায় ২০০টি পরিবার যুক্ত। সকলেই বংশ পরম্পরায় বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকে এই বুনন কাজের সঙ্গে যুক্ত। এক সময়ে তাঁতিরা মাথায় করে শাড়ি নিয়ে কলকাতার অলিগলিতে বিক্রি করতেন। তখন এই শিল্পে প্রচুর মানুষ কাজ করতেন। কিন্তু বর্তমানে হ্যান্ডলুমের শাড়ি বোনা অনেক কমে গিয়েছে। আধুনিক প্রজন্ম আর এই পেশায় আসতে চায় না বলেই আক্ষেপ সিনিয়র শিল্পীদের একটা বড় অংশের।

    বেগমপুরী শাড়ি তাঁতের তৈরি, ওজনে হালকা, নরম এবং অত্যন্ত আরামদায়ক। আসল বেগমপুরীতে সব সময় হ্যান্ডলুম মার্ক থাকে। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কনট্রাস্টিং রঙের পাড়। লাল, কালো, বেগুনি, কমলা ও সবুজ পাড়ের শাড়ি তৈরি করা হয়। এ ছাড়াও, গঙ্গা-যমুনা পাড়, মন্দির পাড় ও নকশা পাড়ের শাড়িও বেশ জনপ্রিয়। এই শাড়ি তৈরিতে মোটা ও সরু — দু'রকম সুতো ব্যবহার করা হয়।

    প্রথমে সুতো কিনে এনে জলে বিভিন্ন দ্রবণ মিশিয়ে রং করা হয়। তার পরে রোদে শুকিয়ে শুরু হয় বুননের কাজ। শেষে শাড়িতে মাড় দিয়ে পরিষ্কার জলে ধোওয়া হয়। একটি বেগমপুরী শাড়ির সর্বনিম্ন দাম ৭০০ টাকা। সর্বোচ্চ দাম হতে পারে ৪ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে, তাঁতিরা পারিশ্রমিক হিসেবে এই দামই পান, তা নয়। আসলে বেগমপুর হ্যান্ডলুম ক্লাস্টারের অধীনে তাঁতিরা শাড়ি তৈরি করেন। ক্লাস্টারের পক্ষ থেকে শাড়ি তৈরি করার সমস্ত কাঁচামাল সরবরাহ করা হয়। তাঁতিরা কাজ করার জন্য মজুরি পান। ক্লাস্টারের পক্ষ থেকে সেই মজুরি দেওয়া হয়। শাড়ি তৈরি হওয়ার পরে তা ক্লাস্টারের মাধ্যমে তা বিক্রি করা হয়।

    বেগমপুর হ্যান্ডলুম ক্লাস্টারের ম্যানেজার শৈল কুণ্ডু জানিয়েছেন, GI স্বীকৃতি মেলায় ক্রেতাদের কাছে একদম খাঁটি জিনিস পৌঁছবে। এর ফলে শাড়ির চাহিদার পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও সরকারি নিয়ম মেনে বিক্রির সুযোগ পাওয়া যাবে। তবে বর্তমানে ক্রেতাদের সুবিধার্থে অনলাইনে কুরিয়ারের মাধ্যমে শাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। পুজোর কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যেই।

    তবু আক্ষেপ যায় না শৈল কুণ্ডুর। জানালেন, বর্তমানে অনেকেই বেগমপুরী শাড়ির নকশা নকল করে বিক্রি করছেন। সেগুলি আসল বেগমপুরী নয়। যে কেউ হাতে নিলেই তফাত বুঝতে পারবেন।

  • Link to this news (এই সময়)