ভোর সাড়ে ৪টে থেকে রাত সাড়ে ৯টা— মঙ্গলবার টানা ১৭ ঘণ্টা ধরে আগুন জ্বলল পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের পাইপ লাইনে। দমকলের অক্লান্ত চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। বুধবার মাইকিং করে এলাকায় কোনও বাড়িতে আগুন জ্বালাতে নিষেধ করেছিল প্রশাসন। জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার ভোরে হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের ন্যাপথা সরবরাহের পাইপ লাইনে আগুন ধরে। দ্রুত সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশে। ঘটনায় ২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে, আহত হন অন্তত ২০ জন। কিন্তু, কেন এত ক্ষতিকর এই ন্যাপথা, কী ভাবেই বা উৎপন্ন হয় এই বস্তু?
ন্যাপথা কী?
ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম থেকে পাতন প্রক্রিয়া দ্বারা প্রাপ্ত এক ধরনের উদ্বায়ী অতি দাহ্য তরল হাইড্রোকার্বন মিশ্রণ। এটি স্বচ্ছ হলদেটে অথবা কালচে রঙের হয়। পেট্রোলিয়ামের শোধনের সময়ে ন্যাপথা উৎপন্ন হয়। হাইড্রোকার্বন অণুর একটি তরল মিশ্রণ হলো এই ন্যাপথা।
কী ভাবে তৈরি হয় ন্যাপথা?
পেট্রোলিয়াম পরিশোধনাগারে অপরিশোধিত পেট্রোলিয়ামকে বিভিন্ন তাপমাত্রায় শোধন করা হয়। প্রচণ্ড উত্তাপে পেট্রোলিয়াম শোধন করার সময়ে তার মধ্যে থেকে বাষ্প নির্গত হয়। সাধারণত পেট্রোলিয়াম শোধনের সময়ে বাষ্প নির্গত হয়ে যাওয়ার পরে যখন ভর প্রায় ১৫ শতাংশের বেশি কমে যায় সেই পর্যায়ে ন্যাপথা সংগ্রহ করা হয়। হালকা এবং ভারী — মূলত দু’ধরনের ন্যাপথা তৈরি হয়। উচ্চচাপে হাইড্রোজ়েনের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে ন্যাপথা শোধন করা হয়।
কী কী কাজে ব্যবহার করা হয়?
১ পেট্রোকেমিক্যালস-এর একাধিক পণ্যে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
২ প্লাস্টিক, পলিমার, সিন্থেটিক ফাইবার এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্য তৈরিতে ন্যাপথা গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৩ গ্যাসোলিন উৎপাদনেও ন্যাপথা অপরিহার্য।
৪ রং, বার্নিশ, কালি, পরিষ্কার করার সামগ্রী এবং রবার শিল্পে দ্রাবক হিসেবে ন্যাপথার ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে বিশ্বজুড়ে।
৫ ড্রাই ক্লিনিং, মোম ও পোকামাকড় মারার ওষুধ তৈরিতে ন্যাপথা ব্যবহার করা হয়।
৬ হায়ার অক্টেন পেট্রল তৈরির কাজেও ন্যাপথা ব্যবহৃত হয়।
কেন এত বিপজ্জনক?
অন্যান্য পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের মতোই ন্যাপথা অতিশয় দাহ্য বস্তু। বাতাসের সংস্পর্শে এলে ন্যাপথা দ্রুত বাষ্পীভূত হয়। সেই বাষ্প বাতাসের সঙ্গে মিশে অত্যন্ত দাহ্য মিশ্রণ তৈরি করে। আগুন লাগলে এর থেকে কার্বন মনোক্সাইড-সহ অন্য প্রাণঘাতী গ্যাস উৎপন্ন হয়। খোলা বাতাস বা উচ্চ তাপমাত্রায় ন্যাপথায় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ন্যাপথার কাছাকাছি থাকা আগুনের উৎস, স্ফুলিঙ্গ বা ধূমপান প্রাণঘাতী বিপদ ডেকে আনতে পারে।
এর পাশাপাশি, ন্যাপথার ঝাঁঝালো বাষ্প কোনও ভাবে মানব শরীরে ঢুকলে মাথাঘোরা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব-সহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। ন্যাপথা সরাসরি ত্বকে লাগলে চর্মরোগ হতে পারে। ন্যাপথা অত্যন্ত উদ্বায়ী যৌগ। খোলা বাতাসে রাখলে অতিরিক্ত বাষ্পীভূত হয়ে বায়ু দূষণ ঘটাতে পারে।
প্রসঙ্গত, এই প্রথম নয়। এর আগেও হলদিয়ার এই ন্যাপথা কারখানায় বিস্ফোরণ হয়েছিল। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসে রুটিন ইনস্পেকশনের সময়ে বিস্ফোরণ হয়। সেই বিস্ফোরণে মৃত্যু হয়েছিল তিন শ্রমিকের। আহত হয়েছিলেন ১০ জন।