হঠাৎ হাজার হাজার টাকা বেতন বেড়ে গিয়েছে তিন পুলিশ কর্মীর। এর কিছুই জানেন না ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। তিন বছর ধরে সুদক্ষ ভাবে চাতুরির সঙ্গে করা এই পুকুর চুরির আঁচ কেউ করতেই পারেনি। কিন্তু সব জারিজুরি ধরা পড়ে গেল AI-এর কাছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-এর সাহায্যে সরকারি অডিটে সামনে এল ছত্তিসগড় পুলিশের এক চাঞ্চল্যকর আর্থিক দুর্নীতির ঘটনা। অভিযোগ, টানা প্রায় তিন বছর ধরে বেতনের নথিতে কারচুপি করে নিজেদের বেতন অবৈধ ভাবে বাড়িয়ে ১.৫ থেকে ২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিন পুলিশকর্মী।
সূত্রের খবর, সম্প্রতি AI-ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে এই অনিয়ম ধরা পড়তেই অভিযুক্ত তিন কনস্টেবলকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তদন্তকারীদের দাবি, সরকারি অডিটে AI প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন আর্থিক জালিয়াতি ধরার ঘটনা রাজ্যে এই প্রথম।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত কনস্টেবল গিরিশ রাই জগদলপুরে বস্তার জেলার পুলিশ সুপারের (SP) দপ্তরে বেতন শাখায় সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল পুলিশকর্মীদের বেতনের বিল তৈরি করা। অভিযোগ, সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি কম্পিউটারে রাখা বেতনের সফট কপিতে পরিবর্তন করে নিজের পাশাপাশি আরও দুই কনস্টেবল—রাজকুমার কাটলাম এবং হেমন্ত ম্যাথিউয়ের বেতন নিয়মিত বেআইনি ভাবে বাড়িয়ে দিতেন। পরে সেই পরিবর্তিত নথির ভিত্তিতেই সরকারি কোষাগার থেকে অতিরিক্ত অর্থ তোলা হতো।
তদন্তে জানা গিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত এই কারচুপি চলেছে। তবে একবারে বড় অঙ্কের অর্থ না তুলে প্রতি মাসে অল্প অল্প করে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হতো। ফলে দীর্ঘদিন বিষয়টি কারও নজরে আসেনি। কিন্তু সেই অল্প পরিমাণে চুরিই একসঙ্গে পুকুর চুরির সামিল। সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ২ কোটি টাকা তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ। তদন্তকারীদের মতে, পুলিশ বিভাগের কর্মী বদলি, নতুন নিয়োগ-সহ একাধিক কারণে প্রতি মাসেই বেতনের খাতে ব্যয়ের অঙ্ক পরিবর্তিত হয়। সেই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে অভিযুক্তরা জালিয়াতি চালিয়ে গিয়েছিলেন।
সম্প্রতি সরকার কমবেশি ২,০০০ পুলিশকর্মীর বেতন সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণের জন্য AI-ভিত্তিক ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করেন। সেই বিশ্লেষণেই কয়েকজন কর্মীর বেতনে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে। এর পরে বিস্তারিত তদন্তে বেরিয়ে আসে দীর্ঘদিনের এই জালিয়াতির ঘটনা। বস্তারের পুলিশ সুপার শালভ কুমার সিনহা জানিয়েছেন, বিপুল পরিমাণ তথ্য অল্প সময়ে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতার কারণেই AI এই অনিয়ম চিহ্নিত করতে পেরেছে।
প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে তিন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রতারণা, জালিয়াতি, বিশ্বাসভঙ্গ এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। আদালত অভিযুক্ত তিন পুলিশ কনস্টেবলকে ১৪ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, এই চক্রে আরও কেউ যুক্ত ছিলেন কি না এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের প্রকৃত পরিমাণ কত?
পুলিশের মতে, এই ঘটনা শুধু আর্থিক দুর্নীতির দৃষ্টান্ত নয়, সরকারি দফতরে এআই-ভিত্তিক নিরীক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বিপুল তথ্যভাণ্ডারে লুকিয়ে থাকা অনিয়ম দ্রুত চিহ্নিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে আরও বড় ভূমিকা নিতে পারে বলেও মনে করছেন প্রশাসনিক আধিকারিকরা।