বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব শেষ হতেই শুরু হয়েছে নকআউটের লড়াই। এখন থেকে প্রতিটি ম্যাচই ‘মরণবাঁচন’। একটি ভুলই শেষ হয়ে যেতে পারে স্বপ্ন। এমন পরিস্থিতিতে আলোচনার আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিওনেল মেসি। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচে ৬ গোল করে সোনালি বুটের লড়াইয়ে প্রথমে রয়েছেন। পাশাপাশি ১৯ গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোলের মালিকও তিনি। ফিফার র্যাঙ্কিংয়ে তিনি কোথায়? প্রথম দশেও বা কারা রয়েছেন?
গোলের পরিসংখ্যানে সবার উপরে থাকলেও ফিফার নতুন ‘পাওয়ার র্যাঙ্কিং’-এ শীর্ষস্থান পাননি মেসি। তিনি দু'নম্বরে। ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপে তৃতীয়। ব্রাজিলের ভিনিসিয়াস জুনিয়র চতুর্থ। টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্ব শেষে এবং রাউন্ড অফ ৩২-এর লড়াই শুরু হওয়ার আগে ফিফা খেলোয়াড়দের একটি নতুন ব্যক্তিগত ক্রমতালিকা প্রকাশ করেছে। আউটফিল্ড খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে আক্রমণ, সৃজনশীলতা এবং রক্ষণভাগ– এই তিনটি ক্যাটাগরিতে ০ থেকে ১০-এর মধ্যে স্কোর দেওয়া হয়েছে।
ফিফার প্রকাশিত সর্বশেষ পাওয়ার র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, জার্মানির স্ট্রাইকার ডেনিজ উন্দাভ ৮.৩৬ আক্রমণ, ৬.৭৮ সৃজনশীলতা এবং ৪.৭০ রক্ষণাত্মক স্কোর নিয়ে তালিকার মগডালে করেছেন। মেসির স্কোর যথাক্রমে ৮.৩৪, ৬.৪৩ ও ৫.১৪। এমবাপের স্কোর ৮.১৩, ৭.২৫ ও ৪.৫৯ এবং ভিনিসিয়াস জুনিয়রের ৭.৯২, ৬.৩৯ ও ৪.৭৫। অবাক করা তথ্য হল, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো প্রথম ১০-এ নেই। বহু যোজন দূরে রয়েছেন তিনি।
পারফর্মারদের জীবন বড়ই নিষ্ঠুর। আজ তুমি যাঁদের কাঁধে বিচরণ করছ, মুহূর্তের ভগ্নাংশের ব্যর্থতায় তোমাকে কাঁধ থেকে ফেলে দিয়ে যাবে ব্যর্থতার গভীর সাগরে। এই দর্শনই হয়তো উপলব্ধি করছেন সিআর৭। তবে ক্রোয়েশিয়াকে হারাতে পারলে গ্যালারি আবার তাঁর গঠিত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হবে। ৫.৭২, ৪.৯৮ ও ৪.৭৪ স্কোর নিয়ে ৭৯ নম্বরে। তিন ম্যাচে দু'টি গোল করলেও সেভাবে ছন্দে দেখা যায়নি।
জার্মানির হয়ে বদলি হিসাবে মাঠে নেমেই এবারের বিশ্বকাপে চমক দেখিয়েছিলেন ২৯ বছর বয়সি ডেনিস উন্দাভ। তিনটি গোল করার পাশাপাশি দু'টি অ্যাসিস্টও করেন। যদিও প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে জার্মানিকে। তবুও তাঁর লড়াই দেখে মুগ্ধ ফুটবলপ্রেমীরা।
পাশাপাশি উন্দাভের জীবন নিয়েও আগ্রহ ফুটবলমহলে। এই জার্মান ফরোয়ার্ডের ফুটবলার হওয়ার কথাই ছিল না। চোদ্দো বছর বয়সি উন্দাভকে বুন্দেশলিগার ক্লাব ওয়ার্ডার ব্রেমেন বাতিল করে দিয়েছিল কম উচ্চতার জন্য। এরপরের জীবন আরও কঠিন। ১৭ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে পেশাদার ফুটবলার হওয়ার জন্য চলে যান। তারপর জার্মানির একটি চতুর্থ ডিভিশনের দল টিএসভি হ্যাভেলসে সই করেন। সেখানে পেতেন মোটে ১২০ পাউন্ড।
এই অর্থে জীবন চলত না বলে একটি কারখানায় কাজ করতেন। দৈনিক আট ঘণ্টা। তার পরেও ছেড়ে দেননি ফুটবলকে। সেখান থেকে প্রথম পেশাদার চুক্তি পান ২৩ বছর বয়সে। ইউনিয়ন সেন্ট গিলোসিতে সই করেন। সেখান থেকে ইপিএলের ক্লাব ব্রাইটন অ্যান্ড হোভ আলবিয়নে। এই ক্লাব খেলে আসেন বুন্দেশলিগার ক্লাব ভিএফবি স্টুটগার্টে। ২০২৫ মরশুমে বুন্দেশলিগায় স্টুটগার্টের জার্সি গায়ে দুরন্ত খেলেন। এখান থেকেই বিশ্বকাপের দলে।
সাফল্যের মাঝেও অতীত ভোলেননি উন্দাভ। স্ট্রাইকার বলছিলেন, “ব্রেমেন উচ্চতার জন্য বাতিল করার পর ভেঙে পড়েছিলাম খুব। কিন্তু আশা ছাড়িনি। সতেরো বছর বয়সে বাড়ি ছেড়েছিলাম। তারপর দৈনিক আট ঘণ্টা কারখানায় পরিশ্রম করেও ফুটবল খেলেছি। সেই সময় ভোর চারটের সময় ঘুম থেকে উঠে কারখানাতে চলে যেতাম। সেখান থেকে সোজা মাঠে অনুশীলন।” কুর্দি-ইয়াজিদি বংশোদ্ভূত এই ফুটবলারের বাবা-মা ইয়াজিদি শরণার্থী ছিলেন।
এই প্রসঙ্গে উন্দাভ বলেছিলেন, “আমার বাবা-মায়ের কাছ থেকে জানতে পারি, তাঁরা আমাকে কীভাবে দেখেন। যা আমাকে ভীষণ গর্বিত করে। অবশেষে আমাদের সম্প্রদায় থেকেও একজন বিশ্বমঞ্চে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে পেরেছে।” সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খিরবেত আল-গাজাল গ্রামে ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বসে জার্মানির ম্যাচ উপভোগ করেন। উন্দাভের মায়ের আত্মীয়স্বজনও ওই এলাকায় থাকেন।