কেরলে অ্যাসিড খেয়ে একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু, আশঙ্কাজনক অবস্থায় এক যুবক...
আজকাল | ২৯ আগস্ট ২০২৫
আজকাল ওয়েবডেস্ক: কেরলে'র কাসারগোড় জেলার বেলুরে এক মর্মান্তিক ঘটনায় একই পরিবারের তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও একজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় লড়াই করছেন। বৃহস্পতিবার ভোরে পরিবারের সদস্যরা অ্যাসিড খেয়ে নেন বলে জানা গিয়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, মৃতরা হলেন গোপী মুলাভেনিভিদু (৫৬), তাঁর স্ত্রী কে.ভি. ইন্দিরা (৫৪) এবং তাঁদের বড় ছেলে রঞ্জেশ (৩৬)। ছোট ছেলে রঞ্জেশ (২৭) গুরুতর অবস্থায় কান্নুর পারিয়ারাম সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
অম্বালাথারা থানার পুলিশ জানায়, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সমস্যায় ভুগছিল। বৃহস্পতিবার ভোরে অ্যাসিড খাওয়ার পর রেজেশ এক আত্মীয় নারায়ণনকে ফোনে বিষয়টি জানান। প্রতিবেশীরা ছুটে গিয়ে দরজা ভেঙে চারজনকে উদ্ধার করেন। খনহানগড় জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে গোপীর মৃত্যু হয়। এরপর ইন্দিরা ও রঞ্জেশকে কান্নার মেডিক্যাল কলেজে স্থানান্তরিত করা হলে পথে তাঁদের মৃত্যু ঘটে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রেজেশের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং তাঁর শরীরের ভেতরে গুরুতর ক্ষত তৈরি হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে আরও জানা যায়, গোপী ও তাঁর ছেলেরা আগে স্থানীয় এলাকায় মুদি দোকান চালাতেন, তবে ক্ষতির কারণে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। রঞ্জেশের বিবাহবিচ্ছেদও ঘটে সম্প্রতি। কয়েক মাস আগে গোপী নিজের জমির রাবার গাছ কেটে নারকেল চারা লাগিয়েছিলেন। ঘটনার পর পুলিশ বাড়িটি ঘিরে ফেলে এবং অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে। ময়নাতদন্ত শেষে দেহগুলি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, পরিবারটি শান্ত ও পরিশ্রমী ছিল। তাঁরা খুব একটা বাইরে মিশতেন না। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, 'ছেলেরা ভদ্র স্বভাবের ছিল। এমন ঘটনা ঘটবে, কেউ ভাবতেই পারেনি।'
প্রসঙ্গত, ভারতে প্রতি বছর আত্মহত্যায় প্রাণ হারাচ্ছেন এক লাখ সত্তর হাজারেরও বেশি মানুষ। বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস (সেপ্টেম্বর ১০) উপলক্ষে দ্য ল্যানসেট–এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আত্মহত্যা রোধের কৌশল কেবল মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক ঝুঁকির কারণগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর সাত লক্ষাধিক মানুষ আত্মহত্যা করেন। এর মধ্যে ভারত বিশ্বের সর্বোচ্চ আত্মহত্যার হারের অন্যতম দেশ। জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর (এনসিআরবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারতে ১,৭১,০০০ মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। জনসংখ্যার অনুপাতে আত্মহত্যার হার দাঁড়িয়েছে প্রতি লাখে ১২.৪— যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
এ বছরের বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য 'আত্মহত্যা বিষয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা'। অর্থাৎ, আত্মহত্যাকে শুধুমাত্র মানসিক রোগ বা ব্যক্তিগত দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত না করে বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটে দেখা। দ্য ল্যানসেট পাবলিক হেলথ–এর ছয়টি গবেষণাপত্রের বিশেষ সিরিজও একই বার্তা দিয়েছে- আত্মহত্যাকে কেবল মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে না দেখে সামাজিক কারণগুলির প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ।
সিরিজের অন্যতম লেখক রাখি দানদোনা, যিনি পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিয়ার (PHFI) জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক, সংবাদ সংস্থা আইএএনএস–কে বলেন— 'ভারতে আত্মহত্যা এখনও দুর্ভাগ্যবশত অপরাধ হিসেবে কলঙ্কিত। কিন্তু আত্মহত্যা আসলে একটি জটিল জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এতদিন প্রতিরোধে মূলত মানসিক স্বাস্থ্যকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা অবশ্যই জরুরি। তবে এখন পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ রয়েছে যে আমাদের দৃষ্টি আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। কেবল মানসিক স্বাস্থ্য নয়, সামাজিক বাস্তবতার দিকেও নজর দিতে হবে।'
গবেষণা সিরিজে আরও বলা হয়েছে, বিপদের মুহূর্তে মানসিক চিকিৎসা পরিষেবা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ কৌশলে সেই সঙ্গে দারিদ্র্য, ঋণ, গার্হস্থ্য সহিংসতা, আসক্তি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো কারণগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করা না গেলে মানুষকে সংকটজনক অবস্থায় পৌঁছানো থেকে বিরত রাখা সম্ভব নয়।
ভারতের জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ কৌশল ২০২২ সালে ঘোষিত হয়, যেখানে একটি সমন্বিত পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। আত্মহত্যার মূল সামাজিক–অর্থনৈতিক ঝুঁকিগুলিকেও সমানভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
দানদোনা জোর দিয়ে বলেন- 'আমাদের আত্মহত্যা সম্পর্কে ভাবনার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করতে হবে। এটি শুধু মানসিক স্বাস্থ্য নয়, বরং সামাজিক নির্ধারকগুলির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।'