• ১৪০ বছর আগে এটিই 'ভারতের প্রথম আধুনিক জল শহর'!  মানুষ তা মানতে চায়নি, জানুন
    আজকাল | ২৯ আগস্ট ২০২৫
  •  

    আজকাল ওয়েবডেস্ক: পুনে, মহারাষ্ট্রের মানুষজন দারুণ গর্ব অনুভব করেন কারণ তাদের শহর ভারতের প্রথম শহর,  যেখানে প্রত্যেক বাড়িতে সরাসরি জল সরবরাহ পাইপ এবং কলের মাধ্যমে পৌঁছেছিল। আজ থেকে প্রায় ১৪০ বছর আগে এই অভাবনীয় সাফল্য পুনে শহরের জন্য এক যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসে। সেই সময়, শহরের মানুষদের নদী, পুকুর এবং কুয়ো থেকে জল সংগ্রহ করতে হত। সেটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং স্বাস্থ্যহানিকর।

    ব্রিটিশ শাসনের আগে পুনে শহরে জলের প্রধান উৎস ছিল কুয়ো, বাওলি (ধাপবিশিষ্ট কূপ) ও পুকুর। বর্ষাকালে এই উৎসগুলো সহজেই দূষিত হয়ে যেত। এর ফলে কলেরা, টাইফয়েড এবং ডায়রিয়ার মতো জলবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ত। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে ১৮১৭ সালে। তখন ব্রিটিশরা পুনেতে একটি ক্যান্টনমেন্ট স্থাপন করে। হাজার হাজার সৈন্য ও তাদের পরিবারকে নিরাপদ ও পরিষ্কার পানীয় জল সরবরাহের প্রয়োজন দেখা দেয়, যা ঐতিহ্যবাহী উৎস থেকে সম্ভব হচ্ছিল না। এতে শুধু স্থানীয় জনগণের নয়, ব্রিটিশ বাসিন্দারাও জলবাহিত রোগে আক্রান্ত হতে থাকেন।

    ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময় পুনে শিক্ষার, প্রশাসনের এবং সামরিক কার্যকলাপের কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হতে থাকে। ভারতের উচ্চবিত্ত শ্রেণি এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের বসবাস এই শহরে বাড়তে থাকে। তারা আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, বিশেষ করে একটি নির্ভরযোগ্য পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থার দাবি জানাতে থাকে।

    এই প্রেক্ষাপটে, ইংল্যান্ডের সফল জনস্বাস্থ্য প্রকল্পগুলো থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৮৫০ সালের দিকে একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়, যার লক্ষ্য ছিল পুনে ক্যান্টনমেন্টে পরিষ্কার জল সরবরাহ নিশ্চিত করা। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ব্রিটিশ তথ্যপ্রযুক্তিবিদরা একটি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। এর মাধ্যমে জল সংরক্ষণ করে পাইপলাইনের মাধ্যমে শহরে তা পৌঁছানো হবে।

    ১৮৭৩ সালে মুথা নদীর উপর খড়কবাসলা বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং ১৮৭৯ সালে এটি সম্পন্ন হয়। চুন-সুরকি ও পাথরের মিশ্রণে তৈরি এই বাঁধ নির্মাণে খরচ হয় প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে বিরাট অঙ্কের অর্থ ছিল এটি। কর্নেল আর.এস. ক্যাপল এবং জে.এইচ.সি. ফিন্ডলে দ্বারা নকশা করা এই প্রকল্পে একটি অত্যাধুনিক গ্র্যাভিটি-ফেড পাইপলাইন ব্যবহার করা হয়, যা প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে শহরে জল পৌঁছায়।

    এই পাইপলাইন তৈরির জন্য ভারী লোহার পাইপ লন্ডন থেকে বিশেষভাবে আমদানি করা হয়। এই পাইপগুলো প্রথমে জাহাজে করে বম্বে (বর্তমান মুম্বই) আনা হয়। তারপর সেখান থেকে গরুর গাড়িতে করে পুনেতে নিয়ে আসা হয়- এটি একটি বিশাল এবং একইসঙ্গে কঠিন কাজ। খড়কবাসলা ও পুনের মধ্যিকার অঞ্চল দুর্গম ও পাথুরে, জায়গায় জায়গায় পাথর কাটতে হয়। ফলে নির্মাণকার্যে ব্যাপক পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়। কাজের সময় বহু শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন, কিছুজনের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে।

    এই সমস্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, প্রকল্পটি ১৮৮০ এর দশকের শুরুতে সম্পন্ন হয়। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ একটি অসাধারণ কীর্তি হিসেবে চিহ্নিত। যখন শহরের ঘরে ঘরে এবং পাবলিক কলগুলোতে জল আসা শুরু করে, তখন আরেকদিকে পুনেবাসীদের মধ্যে ব্যাপক আনন্দ ও উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। শহরের অভিজাতরা এই নতুন ব্যবস্থাকে সাদরে গ্রহণ করেন। তবে তখনও অনেক রক্ষণশীল পরিবার এই নতুন জলের ব্যবস্থাকে ভালো চোখে দেখেনি- তাঁরা ভাবতেন, পাইপের জল কুয়োর জলের মতো পবিত্র নয়।

    কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন স্বাস্থ্যগত উন্নতি দেখা যায় এবং জল সংগ্রহের সুবিধা বাড়ে। তখন এই প্রতিরোধ দুর্বল হতে থাকে। ১৮৯০-এর দশকে এসে শহরে পাইপের মাধ্যমে জল পাওয়া এক প্রকার মর্যাদার বিষয় হয়ে ওঠে। ১৮৮৬ সালের মধ্যে পাইপের মাধ্যমে জল পুনে ক্যান্টনমেন্ট, ব্রিটিশ বাসভবন ও কিছু ধনী ভারতীয় বাড়িতে পৌঁছাতে শুরু করে। পরে পৌরসভার উদ্যোগে এই জল সরবরাহ ব্যবস্থা শহরের বৃহত্তর জনগণের জন্য সম্প্রসারিত করা হয়। এর ফলে কলেরা ও টাইফয়েডের মতো রোগের প্রাদুর্ভাব কমে যায়। পাশাপাশি মহিলাদের ঘন্টার পর ঘন্টা জল আনতে যাওয়ার কষ্ট কমে যায়।

    এই অভূতপূর্ব উন্নয়ন পুনেকে 'ভারতের প্রথম আধুনিক জল শহর' হিসেবে স্বীকৃতি এনে দেয়। মুম্বই, মাদ্রাজ (চেন্নাই) ও কলকাতার মতো শহরগুলোও অনুপ্রাণিত হয়ে একই রকম ব্যবস্থা নেয়। যেদিন শহরের প্রথম ট্যাপ থেকে জল প্রবাহিত হয়, সেদিনকে ইতিহাসের এক গৌরবময় মুহূর্ত হিসেবে ধরা হয়। শিশুরা খুশিতে হাততালি দিতে থাকে এবং স্থানীয় পত্রপত্রিকাগুলো একে 'ভারতের আধুনিকতার প্রথম পদক্ষেপ' হিসেবে বর্ণনা করে।

    বিশ্ব ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে, পাইপলাইনের মাধ্যমে জলের সরবরাহ নতুন কিছু নয়। রোমান সাম্রাজ্যের সময় ধনী বাড়ি ও পাবলিক বাথগুলোতে জল পৌঁছানোর জন্য অ্যাকোয়াডাক্ট, পাথর ও সীসার পাইপ এবং ব্রোঞ্জ কল ব্যবহার করা হত। ১৬০৯ সালে লন্ডনে  নিউ রিভার কম্পানি- এর মাধ্যমে কাঠের পাইপ ব্যবহার করে জল সরবরাহ শুরু হয়। ১৮০১ সালে ফিলাডেলফিয়ায় সিটি-ওয়াইড জল সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি হয়, এবং ফ্রান্সে নেপোলিয়ন আধুনিক পাইপলাইন নির্মাণের নির্দেশ দেন।

    এই প্রেক্ষাপটে, ১৮৮০-এর দশকে পুনের এই পদক্ষেপ ভারত এবং এশিয়ার বহু শহরের তুলনায় এক যুগ এগিয়ে ছিল। পুনে কেবল একটি শহর নয়, বরং এক ঐতিহাসিক নিদর্শন- যেখানে আধুনিক নাগরিক জীবনযাত্রার সূচনা হয়েছিল জলের ধারা দিয়ে।
  • Link to this news (আজকাল)